কবি- লক্ষণ কিস্কুর কবিতা সমূহ

(১) অন্তিম বোল

(এক)
চৈত্রের শেষে
মৃদুভাষীনি বেশে,
চড়ক আসে।
কত কাল
ঘুমিয়ে ছিল
নীরের দেশে!

গাজন তলায়
গাঁয়ের মানুষ
গুনগুন গান গায়।
ঝন্‌ঝনি ওঠে
হাতের খঞ্জণী,
বেজে ওঠে ঢাক ঢোল।
ভেঁসে আসে বোল
শোরগোল
বোলান গানে।

(দুই)
আনন্দ মূখর দিবসে
দেশের মানুষ মিলেমিসে
ঐক্যের বাঁধন বেঁধে
পালা গান গাহে।
বড়’রা বানফোঁড়ে
নিজ নিজ গড়ে।
ছোট’রা মজা করে
নাগর দোলায় চড়ে।।

() বন্ধু তুমি

বন্ধু তুমি, ছিলে মোর মনে
পাখীর নীড়ের মতো মনের কোনে|
বহু খুঁজেছি তোমায়,
হাজার পদ চিহ্নের মাঝে
সকাল থেকে সাঁঝে |
নদীর স্রোতের মতো পেরিয়ে যায় সময়,
জীবনের ঘাটে মাথা কুটে কত প্রলয়|
মাটির টানে মায়ের বন্দনায়
খুঁজে পেয়েছি তোমায়|

বন্ধু, যাবে ভাই
যাবে মোর মুকুটমণির তীরে
লতাপাতা গাছের ছায়া মুগ্ধ পাখীর সুরে |
কাঁসাই কুমারীর মিলন যেথায়
আমি রব বসে তোমার অপেক্ষায়|

আজ মনে হয়
হাজার বছর পরে
পদধূলি পড়িবে মোর ঘরে,
স্মৃতিখানি রোমন্থন করে
আনন্দে অশ্রুধারা ঝরে|

ঐযে দূরে ~ সরোবরের মাঝে
সবুজে ঘেরা সারি সারি দ্বীপ,
নৌকোবেয়ে যাবে সাঁঝে
যেন তুমি প্রদীপ|

হৃদয়ে গাথারবে, চিরে যাওয়া জলোচ্ছাস,
মিটি মিটি তাকাবে তারা, অপেক্ষমান নতুন প্রভাস|
বন্ধু তুমি, কিসের বাঁধনে বেঁধেছ
নেই সুতো, নেই শেকল হৃদয়ে তবু গেঁথেছ||

 

(৩)চিনের খেলনা

(এক)
খেলনার ভিতর খেলনা
ছোট খেলনা,
খেলনার ভিতর খেলনা
আরো ছোট খেলনা,
ছোট খেলনার ভিতর খেলনা
সব থেকে ছোট খেলনা,
স্বপ্ন ঘোর থেকে পুছিনু তারে
জান, কত দ্বারে বন্দী ছিলে তুমি?

তাহা শুনে সে কয়
কিবা দেব মোর পরিচয়,
দুনিয়া ভিতর দুনিয়া
তার ভিতর আরো দুনিয়া,
হরেক রকমের দুনিয়া
কোন দুনিয়া, তুমি চাও?

(দুই)
আমি খুঁজি তোমার ঘর
আমি খুঁজি তোমার দ্বার,
জানতে ইচ্ছে করে তোমার বংশ লতিকা
জানতে ইচ্ছে করে তোমার বসতবাটিকা।

আমি বাতাসে
আমি ঝড়ে,
কণ্ঠরোধে
মানব হ্রদে।।

(৪) আজি এ প্রাতে

আজি এ প্রাতে
কন্ কনে শীতে
বায়ু বয় উত্তুরে
বসে আছি রোদে।
মনে হয় রবি
মিষ্টি বরফি ,
অলস করে
তনু মন।

(৫) বাহিরের ডাক

যমদূত বেশে
এলো কেশে
দূয়ারে দাঁড়িয়ে
করোনা কাশে|

মাগো| তাকে চলে যেতে বল
মাগো| ফিরি আন শুভ পল|
আর কত দিন ঘরবন্দী রবো
মুক্ত মঞ্চে মনখুলে কথা কব?

দেখ দেখি তোরা নিজ ঘরে
মালা খসে গেছে কী ঝরে।
তারি পরে হাসো প্রান ভরে
দাঁড়ায়ে তব আপন দ্বারে।

(৬) করোনা হাওয়া

আজি এ সন্ধায়
করোনা হাওয়ায়
নিশুত দেবালয়
উড্ডীন ঝান্ডায়
লেগেছে আগুন
দেবতার মূখ চুন|

পুরী জগন্নাথ ধাম
জগৎ বিখ্যাত নাম |
থাকতো যদি দেবতা
লাগতো না অগ্নিশিখা
কম্পমান শিরকেতনে|

নাই নাই দেবতা নাই
চারি দেওয়াল মাঝারে
শুন্যতায় ভরা|
ওরা কারা?
দেবতারে পুজিবার নামে
ভন্ডামি করে|
তাই আজ
দেবতা গেছে চলে
কোনো এক ভিক্ষারীর ছলে|

ধরণী ধরে
ধ্বংসলিলা ধেয়ে আসে
ধাসিবার তরে|

সৃষ্টি সূত্র যেরূপ আছে
ধ্বংস চলি তারে পিছে|
মনুষ্য জগৎ চায় মুক্তি
নিজ হাতে সৃজীবে শক্তি|

(৭) করোনা

(এক)

আমি অবেলা, গাহি মৃত্যুর গান
আমি নিশীথ রজনী, চিনি গো চিনে
বিষাক্ত বায়ু বয়ে, জীবন নিয়েছি লয়ে |

আমি ধ্বংস করতে পারি
থামিয়ে বৃষ্টি, জীবন সৃষ্টি |
শহর-নগর হাহাকার
জনশূণ্য দেবতার দ্বার |

মানুৃষের ভুল একচুল
উথলিয়া ঢেউ ভাঁগিবে দুকুল |
করোনা আমায় নিয়ে খেলা
শবদেহে বায়বো যে ভেলা |

(দুই)

বাতাসে বহে করোনা ভাইরাস
মানব সভ্যতায় ত্রাস আর ত্রাস |
এসো হে বিঞ্জানী, এসো হে সন্ধানী
এসো এসো সবাই, মৃত্যুভয় দূর করি ||

(৮) অঞ্জলি

কাজহারা শ্রমিকের দল
হংস বলাকার মতো
চলেছে নিজের ঠিকানা,
শিকারীর ফাঁদে পড়ে
মাটিতে প্রাণ গড়াগড়ি করে
কেও বাড়ি ফেরে
কেও গাড়ী চাপা মরে।
এল ঘরে শব দেহ
দুয়ারে দাঁড়ায়ে নেই কেহ,
মুখ ঢাকা- বুক ফাটা কান্না
ঝরা ফুল চাই না —
আমার জীবনও
যায় যাক না।
হাহাকার জীবন লয়ে
স্মৃতি খানি বয়ে
কী আশায় বাঁধি খেলা ঘর।।

২১/০৫/২০২০ রানীবাঁধ

(৯) জঙ্গলমহল

রাঢ় বঙ্গের ধূলি ধূসর দুশ্চর
বনানী পথ বেয়ে সাঁওতাল মেয়ে
মাথায় নীরস তরু ঝুরি, খোঁপায়
কেয়া ফুল, কর্ণে হাটের সস্তা দূল
মল ছিন্ন বসন লজ্জা নিবারণ
প্রক্ষিপ্ত যেন স্বর্ণলতা আচ্ছাদন
কাজল কালো হরিণী, তার নয়ন
শীর্ণ কটিতে ঝুমকোলতা মেঘলা
চাঁদবদন শিশু; চলন একলা।
শতশত পদ্ম ফোটে বাঁকড়া গড়ে
তিমিরাচ্ছন্ন জঙ্গল দূর দক্ষিণে।
উদিত হোক তব ভারত সংসারে
দ্বীপ্তিমান প্রভাত সভ্যতার স্রোতে।।

২২/০৫/২০২০ রানীবাঁধ

কবিতার নাম – নেই কোন ক্ষমা
কলমে – গুরাই কিস্কু

হারিয়ে গেছে মনুষ্যত্ব
হারিয়ে গেছে মন
হারিয়ে গেছে মান
হারিয়ে গেছে হুঁশ
হারিয়ে গেছে মায়া
হারিয়ে গেছে মমতা
নিভৃতে কাঁদে মানবতা।

জাহির করে ক্ষমতা
নৃশংস মানুষ জন।

অবলা নিরীহ হস্তিনী
গর্ভে নিষ্পাপ শাবক
জানেনা কিছু, থাক
নির্বাক ব্যাথা ভরা বার্তা।

মাতা চাহে,– শিশুকে
নিরাপদে ভৃমিষ্ট করতে
নেমে ছিল স্রোতস্বিনী জলে
পৃথিবীর আলো দেখাবে বলে।
কিন্তু, পরেনি–।
বোমা ফেটে
পেট খানখান।
চোখে জল
শরীর টলমল
নিভ প্রদীপ
তিমি তল
আসাড় ঢল।
ভাবে ভোর
নিষ্ঠুর জন।

যদি, পশু না হয়ে
কোন স্বজন হতো
বুকে ব্যাথা বইতে
পারতে কি তুমি?

আসতো বুক ভরা কান্না
জুড়ে যেতো ধরণা।
শুধু আকাশে বাতাসে
উঠতো ধ্বনি –‘.. হত্যাকারীর
শাস্তি চাই। শাস্তি চাই। ‘

আজ জেগে ওঠ
জীবে প্রেম কর যে জন
সুরে সুর মিলিয়ে বলি–
যাহারা দিয়াছে আনারসে বোমা
তাহাদের নেই কোন ক্ষমা।।

০৪/০৬/২০২० রানীবাঁধ

পুরাণ গাঁথা

প্রণতি দেব। আদি ‘বিন্‌তি-বাঁখেড়’–

সেকেলে কিস্কু রাজন, মান্ডী কুবের,
টুডু মাদল বাজায়, বাঁশির সুর
তেপান্তর ছাড়ি যায়, দূর-সুদূর।
মুরমু পূজারী, পুঁথি পঠন তার
লিখন বার্তা চলে — গড় থেকে গড়ে।
হাঁসদা বিচারক, হেম্ব্রম কুমার
চক্রচূড়ে মাটি — গড়ি হাঁড়ি – কলসি,
বেসরা ফেরি করে — হরেক বেসাতি,
বাস্কে বানিজ বেপারী– রঙ বাহারী,
চায়-চম্পা নগর– ভেসে যায় তরী,
সরেন সিপাহী– ফেরায় কালা ফেরি
বাদোলি কঁয়ডা গড়ে হাঁক যে ছাড়ি।

০৯/০৬/২০২०