হুল বিদ্রোহ ও বর্তমান সাঁওতাল সমাজ (পর্ব ১)

লেখক – বীরেন্দ্রনাথ কিস্কু

আজ দেখতে দেখতে 166 তম বর্ষ পেরিয়ে যেতে চলেছে 30 শে জুন হুল দিবস। 30 শে জুন ‘ হুল দিবস ‘ সারা ভারতবর্ষের আদিবাসীদের কাছে বিরাট গৌরবের দিন, আত্মমর্যাদার দিন, আদিবাসীদের কাছে এটা শহীদ দিবসের দিন , তাই আজকের দিনটা অন্যান্য দিনের তুলনায় অনেকটাই আলাদা ও রোমাঞ্চকর।আপামোর ভারতবাসী যেমন 15 ই আগস্ট ‘ স্বাধীনতা দিবস’ এর দিন আবেগঘন হয়ে পড়ি তেমনি আজ 30 শে জুন সাঁওতালি আদিবাসী মানুষ আবেগঘন হয় পড়েন ।

আজকের এই 30 জুনের কথা কমবেশি সকলেই জানি বা আজকে মাল্টিমিডিয়ার দৌলতে সবাই অবগত। 1855 সালের 30 শে জুন বীর সিধু কানুর ডাকে 30000 অধিক আদিবাসী মানুষজন সমবেত হয়ে বিদ্রোহের সূচনা করেছিলেন তৎকালীন ইংরেজ জাতির বিরুদ্ধে। এই ইংরেজ জাতিরা ব্যবসা-বাণিজ্য করার নাম করে ধীরে ধীরে ভারতবর্ষকে শাসন করতে শুরু করে 1857 সালের পর থেকে । এই ইংরেজ জাতির ছিল বড়ই নিষ্ঠুর সাধারণ ভারতবাসীদের কাছ থেকে জোরপূর্বক খাজনা আদায় হোক বা জোর করে নীল চাষ করতে বাধ্য করা এসবই ছিল তাদের কাজ। সে নিঃসংশ জাতির তাবেদারাও কম যাননি, তোরাই সব থেকে বেশি আদিবাসীদের উপর অত্যাচার চালাত। এরা ছিলেন ইংরেজ জাতির যোতদার , জমিদার ও মহাজন। উনারা কিন্তু ইংরেজদের না নিজের স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য ইংরেজ জাতির তাবেদার করতেন।

সহজ-সরল মূর্খ আদিবাসীদের কে ঠকিয়ে জোরপূর্বক খাজনা আদায় করে নিজের ধরার পূর্ণ করার সাথে সাথে ইংরেজদের কাছে নিজের আনুগত্য জাহির করতেন। আদিবাসীরা স্বাধীনচেতা মনের মানুষ, তারা কখনোই কারো অত্যাচার সহ্য করতে নারাজ ছিলেন তাই তারা জমি-বাড়ি ছেড়ে আরও গভীর জঙ্গলের ভেতর বন জঙ্গল কেটে জমি তৈরি করে চাষাবাদ শুরু করলেন । কিন্তু তাবেদার করা যাহার কাজ তিনি কি চুপ করে থাকেন খুঁজে খুঁজে সেখানেও গেলেন এবং খাজনা আদায় করার জন্য অত্যাচার শুরু করলেন। নিজের জমিতে নিজেই চাষাবাদ করার পরও আবার খাজনা কিসের? স্বাধীনচেতা মানুষ আদিবাসী রা প্রতিবাদ করলেন কিন্তু তারপর তাদের উপর ইংরেজ সৈন্য লেলিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ইংরেজ সৈন্যরা সমস্ত কিছু কেড়ে নিয়ে চলে গেলেন। অসহায় দরিদ্র আদিবাসী মানুষজন মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিতে বাধ্য হলেন। কিন্তু এই আদিবাসী মানুষজন জানতেনই না যে এই ঋণ এই জন্মে কোনদিন শোধ হবে না। ঋণের জালে জড়িয়ে জড়িয়ে আদিবাসী মানুষজন ঘরবাড়ি গৃহপালিত পশু সমস্ত কিছু হারালেন।

দিনে দিনে আদিবাসী মানুষজন অত্যাচারী ইংরেজদের, জমিদারদের ও মহাজনদের উচিত শিক্ষা দেওয়ার জন্য আদিবাসী সাঁওতাল যদি তীর ধনুক হাতে তুলে নিলেন 1855 সালের 30 শে জুন হুল অর্থাৎ বিদ্রোহের সূচনা করলেন। সিধু কানু ঘোষণা করলেন এ দেশ থেকে সাত সমুদ্র তেরো নদী পার ইংরেজদেরকে তাড়িয়ে দিতে হবে। ভারত মাতার উপর তাদের অত্যাচার চলতে হবে না, এই দেশ হলো আমাদের ,এখানে আমাদের রাজত্ব চলবে ইংরেজদের নয়। এ পর্যন্ত সামনে অনেকের জন্য প্রাণ বিসর্জন দিলেন।

প্রথমত ইংরেজরা পরাজয় স্বীকার করে পিছু হটলেন। কিন্তু তীর ধনুক এর সাথে গোলাবারুদ এর লড়াই লড়াই খুবই অসমান। তাই যা হওয়ার তাই হল শতাধিক আদিবাসী যোদ্ধা গোলাবারুদের সামনে নিজের প্রাণ বলিদান করলেন। শত শত মহিলা বিধবা হলেন ও আর করুন হলো তাদের দশা। যাইহোক এই বিদ্রোহ ছিল প্রথম ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম বা বিদ্রোহ। এই বিদ্রোহ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে দুই বৎসর পর শুরু হয়েছিল 1857 সালের সিপাহী বিদ্রোহ এতে কোন দ্বিমত নেই। যদিও এই হুল বিদ্রোহকে অনেকেই স্বাধীনতা বিদ্রোহ বলতে চান না, আর চাইবেন কেন? এই ভারতবর্ষের তথাকথিত উচ্চবর্ণের মানুষরাই যারা ইংরেজ শাসন কালে ইংরেজ যাদের তাবেদারি করতেন তাদের সম্মানে আঘাত লাগবে না!!! তাই নিজেদের লজ্জা ঢাকার জন্য 1857 সালের বিদ্রোহ তৈরি করেছিলেন এবং তার ইতিহাস রচনা করলেন। কথায় আছে না গোবর গাদায় পদ্মফুল কি শোভা পায়!! কিন্তু সেই ফুল কে দেখে উনারা পদ্ম ফুল চিনতে পেরেছিলেন।

আজ আমাদের ভারতবর্ষে স্বাধীনতার 73 বছর পার করতে চলেছে। আজকের দিনে যদি ফিরে থাকায় আজকের আদিবাসী সমাজ কোথায়? কোন অন্ধকার গলিতে না আধুনিক বিজ্ঞানের আবিষ্কৃত কৃত্রিম আলোতে? এই প্রশ্নের উত্তর পেতে আপনাকে বেশি বই পত্র পড়াশোনা করার দরকার পড়বে না, শুধু একবার কোন এক আদিবাসী পাড়ায় বা গ্রামে ঘুরে আসুন চিত্রটা পরিষ্কার বলে দেবে আপনাকে। পরাধীন ভারতের আদিবাসী সমাজ ও স্বাধীন ভারতের আদিবাসী সমাজের মধ্যে পার্থক্য বেশি কিছু পাবেন না ,যে পার্থক্যটা পাবেন সেটা হল কর্মঠ ,স্বাধীনচেতা আদিবাসী তথা সাঁওতালদের অভাব।

স্বাধীনতার এতগুলো বছর পরও এখনো অনেক আদিবাসী গ্রামে গড়ে ওঠেনি কোনো শিক্ষা কেন্দ্র, এখনো সমস্ত আদিবাসী তথা সাঁওতাল জাতি তাদের মাতৃভাষায় পড়াশোনা করার সুযোগ পায়নি। আজও দেখতে পাবেন পান্তা ভাত খেয়ে গরু ছাগল নিয়ে যায় আদিবাসী কিশোর-কিশোরী। আদিবাসীরা আজকেও স্বাধীনতার পেয়ে আসছে অধীনতার স্বাদ। এখনো আদিবাসীদের উপর নানা ভাবে নেমে আসে অত্যাচার-অবিচার ও হেনস্থা। আজকের দিনে শিক্ষিত শয়তান থেকে শুনতে হয় অশিক্ষিত জাতির কথা কুসংস্কারের ভরা সমাজের কথা। বাবুদের সমাজ যেন কতই না সংস্কারে ভরা, আমারতো জানা নেই। চাকরি ক্ষেত্রে, কর্ম ক্ষেত্রে আদিবাসীদের অপমানিত ও লাঞ্ছিত হতে হয়, শুনতে হয় অনেক কটু কথা।

না – প্রতিবাদ করাটা যেন আদিবাসীদের সাংবিধানিক অধিকার নয়, বিচার ব্যবস্থা তে তাই অনেকেই আস্থা হারিয়ে ফেলেন। ৭.৫ শতাংশ কার্যক্ষেত্রে 5% সংরক্ষণ দিয়ে আদিবাসী সমাজটাকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। জোরপূর্বক কেড়ে নেয়া হচ্ছে জমি বাড়ি, না ভুল বললাম জোরপূর্বক আইন প্রণয়ন করে কেটে নেওয়া হচ্ছে। জঙ্গলমহলের আদিবাসীগন জঙ্গলের কাঠ পাথর উপর ভরসা করে দিনযাপন করে, তাদের ই উপর করা হচ্ছে হুইপ জারি। জঙ্গলে প্রবেশের অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। যে জঙ্গলটা আদিবাসীরাই মাতৃস্নেহে লালন-পালন করে আজ ও টিকিয়ে রেখেছেন সেখান থেকে তাদের তাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। বিজ্ঞানের যুগে নাকি সবই সম্ভব, টাকা দিয়ে অক্সিজেন পাওয়া যায় তাই কল কারখানা করার নামে নির্বিচারে চলে অরণ্য নিধন তখন কোন আইন নেই ,নেই কোন পরিবেশ রক্ষার্থে কোন বিরোধিতা শুধুমাত্র আদিবাসীরা অরণ্য নিজের জীবন জীবিকার স্বার্থে ব্যবহার করলেই চলে আসে কত আইন-আদালত।