হুল বিদ্রোহ ও বর্তমান সাঁওতাল সমাজ (পর্ব ২)

লেখক-বীরেন্দ্রনাথ কিস্কু

“বৃথা এ মনের আশা ,মরিতে মরিতেও মরে না ……..”

আজ স্বাধীনতার 73 বছর পরও ভারতবর্ষের আদিবাসীরা কিন্তু স্বাধীনতার স্বাদ তথা বঞ্চনা অত্যাচারের হাত থেকে মুক্তি পেলেন না। আদিবাসীরা সেই আদিকাল থেকেই সেই একই মন্ত্রোচ্চারণ করে আসছে এইবার বুঝি ভাগ্যের চাকা ঘুরবে……….. আমাদের দুঃখ দুর্দশা ঘুচবে শত বঞ্চনার হাত থেকে মুক্তি মিলবে……….. এইতো ভালো সরকার ক্ষমতায় আসছে। সেই মনের আশাকে বুকে রেখে চলেছে কতদিন কতরাত……….। কিন্তু না এই সমস্ত সহজ সরল আদিবাসীদেরকে যুগ যুগ আগে থেকেই যেমন ঠকিয়ে আনা হয়েছে আজও তার পুনরাবৃত্তি হয়েই চলেছে মাত্র। শাসক বদলেছে, বদলেছে সরকারের মুখ কিন্তু আজও বদল হয়নি আদিবাসীদের উপর নির্যাতন, লাঞ্ছনার ইতিহাস। কোথায় আছে ” যাহারা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে তৈরি করেন রাজপ্রসাদ তাহাদের সারাটা জীবনে ই থাকে ঝুপড়িতে বাস।” রাজপ্রসাদে তারা যেমন থাকেন সর্বদা অচ্ছুৎ, তেমনি আজ এই দেশের আদিবাসীদের দশা। এই বঞ্চনার চক্রবুহ্য হতে বের হওয়ার সমস্ত রাস্তায় যেন আজ বন্ধ। ঘোর অন্ধকারের জন্য যেমন অমাবস্যা দায়ী তেমনি তা সূর্য গ্রহন ও হতে পারে।

স্বাধীনতার 73 বছর পরও আদিবাসীদের সংবিধানের মৌলিক অধিকার গুলো যেন আজকেও ঝাপসা হয়ে আছে। আজব দেশের সিংহভাগ ও আদিবাসীরা আদিবাসীদেরকে অচ্ছুৎ ভেবে আসে। মানবিক বোধ ও মানবিকতা শব্দ যেন শব্দ ভান্ডার থেকে ও শেষ হওয়ার মুখে। আজও নেমে আসে জাতপাত, ধর্মের নামে অবিচার , অত্যাচার সেই ভূমিপুত্র আদিবাসীদের উপর। আদিবাসীরা যে এই দেশের একমাত্র আদিম অধিবাসী তাতে কোনো দ্বিধা নেই কিন্তু তথাকথিত এক শ্রেণীর অসাধু মানুষ এই ইতিহাস মানতে নারাজ। আর যাই হোক ইতিহাস মানুষ বা না মানুষ সেটা আপনার ব্যক্তিগত মতামত কিছুই যায় আসে না। কিন্তু সমস্যাটা হলো একশ্রেণীর মানুষ আছেন যারা নিজের সারাটা জীবন আদিবাসীদের বিদ্বেষ ছড়িয়ে যাওয়ায় তাদের এক এবং অদ্বিতীয় কাজ হয়ে উঠেছে। আর বলতে একটু দ্বিধা কষ্ট নয় যে এই সমস্ত মানুষের পেছনে একশ্রেণীর দলবাজদের সমর্থন থাকে বা আছে। এদের বিরুদ্ধে কোন প্রকার পদক্ষেপ গ্রহণ করা তো দূরের কথা পরক্ষনেই এদের পেছনে প্রচ্ছন্ন মত প্রদান করেন বাকি অন্য সকল ও। তাইতো আজও আদিবাসীরা সমাজের মূল স্রোত থেকে শত যোজন দূরে পাহাড়-জঙ্গলে ঘেরা ঝরনার গা ঘেঁষে বসতি স্থাপন করেছেন। আদিবাসীদের কাছে জঙ্গলের গাছই দেবতার স্বরূপ, সেই গাছগুলো কেই তারা পূজার্চনা করে আসে। সেই আদি অকৃত্তিম দেবস্থান “জাহের থান “সারা বিশ্বব্যাপী একটি নিদর্শন। কিন্তু বর্তমানে সরকার ও তাহার অধিকার কেড়ে নেওয়ার জন্য উঠে পড়ে লেগেছেন। আমি বুঝতে পারিনা এই আদিবাসীদের অপরাধ কোথায়? ………… কেন তারা অরণ্যে গাছের পূজার্চনা করে বলে? না…….. অন্য কোন ?তার কোন ব্যাখ্যা নেই। শুধু মাত্র বলা হয় অরণ্য রক্ষার্থে, অরণ্যে বন্য প্রাণী রক্ষার্থে আইন আনা প্রয়োজন। কিন্তু একটু ভাবুন তো আদিবাসীরা বহু বছর আগে থেকেই অরন্যের পাশে নদীর তীরে বসবাস করে আসছে । আদিবাসীরা অরণ্যের শত্রু হলে আজ পর্যন্ত কি অরণ্যের অস্তিত্ব থাকতো! কোন জননেতা না মন্ত্রী আসবেন বলে যখন অরণ্য নিধন যজ্ঞ শুরু হয় তখন সবাই কেন হাত গুটিয়ে থাকেন! কেন তিনি আদিবাসী নন বলে? হাজারটা পূর্ণবয়স্ক গাছ কেটে, 50000 গাছের চারা লাগিয়ে কি তার বিকল্প হয়ে উঠতে পারে?

আজকের অধিবাসীরা সকলেই জানি আদিবাসীদের মধ্যে সঠিক শিক্ষা প্রয়োজন হলে তাদের মুখোশ খুলে যাবে তাইতো তারা বিভিন্ন উপায়ে সরকার এর সাহায্যে আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলে শিক্ষার অধিকার থেকে আদিবাসীদেরকে দূরে রাখার চেষ্টা করে থাকেন। আজকে দেখুন আদিবাসীদের হোস্টেলে থেকে পড়াশুনা ব্যবস্থা ছিল তা সরকার বন্ধ করে দিয়েছে এটা একটা ছোট্ট বিরাট পদক্ষেপ। আদিবাসীদের কাছে কতটা তা কিন্তু খুবই পরিষ্কার প্রথাগত শিক্ষা না থাকলেও তারা কিন্তু সুযোগ খুব কমই হয়ে উঠতে পারেন। শিক্ষিত আদিবাসীদেরকে তপশিলি উপজাতি বলে এখনো উপহাস করে থাকেন। আমাদের দেশের এই এক রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী বলেন ” তপশিলি উপজাতি ছেলেমেয়েরা পড়তে আসে স্টাইপেন্ড টাকার জন্য”। ভাবো কত বড় একজন অপদার্থ, দায়িত্বজ্ঞানহীন ,অযোগ্য মন্ত্রী হলে কথা বলা যায়। তিনি তো সারা বিশ্বের মূর্খ গুলোর মধ্যে শ্রেষ্ঠ স্থান পাওয়ার যোগ্য।যাইহোক শিক্ষা মন্ত্রী কথা তোমার কান্না নয় তাই তপশিলি উপজাতি কোটা পূরণ করার জন্য একদল অসাধু অফিসার ও আদিবাসীদের তপশিলি উপজাতি শংসাপত্র প্রদানের মাধ্যমে তাদেরকে তপশিলি পটায় চাকরিতে বহাল করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছেন ও তার ফলাফল আসতে শুরু হয়েছে।যেখানে আদিবাসীদের সংরক্ষণের মাধ্যমে পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে সে সামান্য প্রদীপের আলোতে অন্যর আলোকিত হচ্ছে যে বা যারা সামনে বসে আছে তাদের সামনে অন্ধকার এখনো বিরাজমান।

ভারতবর্ষকে স্বাধীন করার জন্য ভূমিপুত্রদের অবদান ইতিহাস হল অতীত ও সুশিক্ষিত উচ্চবর্গের মানুষজন এটাকে ইতিহাস থেকে চিরতরে মুছে ফেলার জন্যই যেন ইতিহাস বিদ হয়ে উঠেছেন। আদিবাসীদের একতা ও আন্দোলনের ফলে সংবিধানের অষ্টম তফসিলে সাঁওতালি ভাষার অন্তর্ভুক্তি করতে বাধ্য হয়েছে, তুমি আজকে তারপর স্যার উন্নতির জন্য কোন প্রকার সদিচ্ছা র দেখা নেই বরং উদাসীনতার ফলে অবলুপ্তির দিকে ঠেলে নিয়ে চলেছেন। ইতিহাসের পাতায় জ্বলজ্বল করে ছাপা হয়েছে 30 শে জুন 1855 সালের “হুল বিদ্রোহের” কথা কিন্তু তাতে কোথাও একবারও লেখা নেই এটাই ভারতের প্রথম স্বাধীনতা আন্দোলন। সিধু কানহু দেশের স্বাধীনতার জন্য প্রাণ বিসর্জন দিলেন তবু তারা পেলেন না শহীদের মর্যাদা। প্রতিবছর আদিবাসীরা এই 30 শে জুন” হুল দিবস” কে শ্রদ্ধার সঙ্গে পালন করে আসছেন।”হুল দিবসে “আদিবাসীদের স্বতঃস্ফূর্ত যোগদান কর্মকাণ্ডের শামিল হয় নিজের স্বার্থ চরিতার্থ করার তাগিদে একশ্রেণীর রাজনৈতিক দল নিজের ভোট ব্যাংক এর কথা মাথায় রেখে আদিবাসীদের ভাবা বেগের মধ্যে নিজের দাতা ,ত্রাতার মানবিক মুখ উজ্জ্বল করার জন্য সাড়ম্বরে সিধু -কানুর অবয়ব ছাড়াই টাকার প্রলোভনে আদিবাসীদের এনে “হুল দিবস “পালন করছেন। এটা একটা ছোট্ট পদক্ষেপ “হুল দিবস” কে অপমান করার ও ইতিহাস থেকে চিরতরে মুছে ফেলার। আর এটা যদি কোন সরকারের অনুষ্ঠান হয় তাহলে তো বলার অপেক্ষা রাখে না। সেই সরকারের আস্থাভাজন মানুষ আরো একধাপ উপরে উঠবেই। তাইতো সিধু কানহু মূর্তি ভাঙতে পিছপা হন না। কারণ তারা ভালো করেই জানেন সরকার তাদের পাশে থাকবে তাদের শাস্তি হবে না। তাছাড়া আদিবাসী শহীদদের সামনে তাদের মাথানত করতে দ্বিধাবোধ করবে না! যাই হোক আরো অনেক আদিবাসী রাজনৈতিক নেতারা থানা হয়েছে ওই সংরক্ষণের আলোতে, তাদের মুখ কিন্তু হঠাৎ কেমন আটকে গেছে তারা যেন ভোটে জিতে বোবা হয়ে গেছেন। যাইহোক আদিবাসীরা এর বিরুদ্ধে সারাদেশব্যাপী দ্বিতীয় গোলের সূচনা করবেন। সেই হুল থেকে কেউ রেয়াত পাবেন না।

এদেশের সকলেই জানেন আদিবাসীদের মধ্যে একতা বোধ কতটা শক্তিশালী হয়। সেই একতাবদ্ধ না ভাঙতে পারলে আদিবাসীদের উপর শাসন কায়েম করা দুষ্কর।তাই খুব সাবধানে সহজ-সরল আদিবাসীদের সাথে মিশে মন্ত্রীত্বের লোভ অথবা টাকা পয়সার লোভ দেখিয়ে সমাজের মাঝে বিষাক্ত রাজনৈতিক বীজ কিন্তু বপন করে ফেলেছেন। একই গ্রামের দুই ব্যক্তিকে দুই রাজনৈতিক দলের প্রার্থী করে দেওয়ার মাধ্যমে এই কাজটি তারা খুব সহজেই করে ফেলেছেন। কিন্তু সার্বিক হবে যখন আদিবাসীরা সমাজের সর্বোচ্চ পর্যন্ত সঙ্ঘবদ্ধ তাই এটা বেশিদিন তাদের বিভাজিত করে রাখতে পারবেনা সেই চিন্তা ধারা থেকে উপরের অস্ত্র রাজনৈতিক বীজ রোপন করার মাধ্যমে সমাজের মূল কাঠামোকে ভেঙ্গে চুরমার করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছেন রাজনৈতিক দলগুলো। নিজের সুবিধার্থে আদিবাসীদেরকে পুতুল নাচের মতো নাচানো হচ্ছে। আর অল্প শিক্ষিত আদিবাসীরা সাধারণ জ্ঞান পর্যন্ত তাদের লোপ পেয়েছে টাকার লোভে।

পরিশেষে এটাই বলব আজকে আদিবাসীরা সকলেই বুঝতে পেরেছেন আর না…………. আদিবাসীরা আজ একজোট………. কেড়ে নেওয়ার জন্য তৈরি তাদের অধিকার………… তৈরি করার জন্য সমাজের শক্ত ভিত, আজকে সবাই হয়েছে নির্ভীক। শাসক তুমি হও সাবধান, অচিরেই আদিবাসীরা ছিনিয়ে আনবে তাদের পরিত্রান।