বিশ্বের ইতিহাসে সংযোজিত হলো নতুন এক অধ্যায়

ওরা কারা ?? – ওরা সাঁওতাল।।

সাঁওতাল কাদেরকে বলা হয় ?? – যারা একসময় সিন্ধু সভ্যতা, মহেঞ্জোদাড়ো সভ্যতা গড়ে তুলেছিল যারা পৃথিবীর বাস্তুতন্ত্র কে টিকিয়ে রাখার জন্য প্রকৃতির উপাসনা করতে শুরু করেছিল, যাদের মননে চিন্তনে শুধুমাত্র সেবা ও ভালোবাসা সদা সর্বদা বিরাজমান। যারা চিরকাল একসাথে সমাজবদ্ধ হয়ে সুখে শান্তিতে জীবন যাপন করতে চায়। এই সুন্দর পৃথিবীকে ভালো মানুষের ভালোবাসায় পরিপূর্ণ করতে চায়; ওরাই সাঁওতাল।

বিশ্বের ইতিহাসে বা ভারতের ইতিহাসে সাঁওতালদের বিষয়ে পূর্ণ তথ্য সংযোজন করা হয়নি। বিশ্বের মানুষেরা শুধুমাত্র জানে যে সাঁওতাল এক উপজাতির নাম এবং ওদের মাতৃভাষা হলো সাঁওতালী এর থেকে বেশী আর কেউ জানে না। শুধুমাত্র সাঁওতালদের ইতিহাস নিয়ে যারা অধ্যয়ন করেছে তারাই জানতে পেরেছে সাঁওতালদের পরিচয়। বর্তমানে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় সাঁওতালদের বিষয়ে লেখা প্রকাশিত হচ্ছে কিন্তু ঐসব লেখার গুরুত্ব ঐতিহাসিকরা এখনো দেয়নি; হয়তো দেবেও না। কারণ সাঁওতাল জাতির ইতিহাস সংযোজন করা হলে সুবিধাভোগী প্রতারকদের দ্বারা সাজানো ইতিহাস পুরোটাই মিথ্যা প্রমাণিত হবে এবং আজীবনের জন্য মুছে যাবে।





ইতিহাস রচয়িতাদের অবিচার ব্যাতিত সাঁওতালদেরও কিছু দুর্বলতা রয়েছে যে কারণে আজ একবিংশ শতাব্দিতেও অবহেলিত ও বঞ্চিত। সেই দুর্বলতাগুলি হলো স্বাধীনভাবে রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জন না করা এবং প্রশাসনিক স্তরে সাঁওতালদের প্রতিনিধিত্ব করতে না পারা।

কারণ ভারতবর্ষ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই অনেক মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীরা উচ্চশিক্ষা লাভ করে বিভিন্ন প্রশাসনিক আধিকারিক হিসেবে জনগণের সেবা করে এসেছে কিন্তু যখন কেবলমাত্র সাঁওতালদের প্রয়োজনীয় মৌলিক অধিকারের জন্য আন্দোলন করতে হয় তখন ঐ সমস্ত সাঁওতাল আধিকারিকরা কোনরূপ সহমত পোষণ করে না। আন্দোলনকারীদের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগও করে না এবং কোন কোন আইনি লড়াইয়ের ক্ষেত্রেও সাঁওতালদের স্বপক্ষে অন্যান্য জাতির উকিলরা লড়াই করে কিন্তু সাঁওতাল উকিলরা আইনি সহায়তা প্রদান করে না।

অপরদিকে এখন পর্যন্ত অনেক সাঁওতাল নেতা রাজনৈতিক শাসনকার্য পরিচালনা করার জন্য নির্বাচিত হয়েছে কিন্তু তার মধ্যে অধিকাংশই অন্যান্য জাতির গঠিত রাজনৈতিক দলের সহযোগিতায় নির্বাচনে জয়লাভ করে এসেছে এবং তাই তাদেরকে ঐ রাজনৈতিক দলের নিয়ম ও নীতির মাধ্যমে কাজ করতে হচ্ছে তারপরে ওদের আর কোন বাকস্বাধীনতা থাকছে না। সেইজন্য ওরা নিজের জাতির অভাব-অভিযোগের কথা, অপ্রাপ্ত মৌলিক অধিকারের কথা বলতে পারছে না।





সাঁওতাল জনগণরা নির্বাচনের সময় প্রার্থীর যোগ্যতা ও ব্যক্তিত্বকে দেখে ভোট দেয়না। সাঁওতালরা রাজনীতি (নির্দিষ্ট নীতির মাধ্যমে রাজ করা) কি এবং কেন তা জানেনা। নিজেদের কিছু সংগঠনের মাধ্যমে এবং রাজনৈতিক মন্ত্রীদের পূর্ণ সমর্থন থাকার জন্য কিছু মৌলিক অধিকার আদায় করা সম্ভব হয়েছে কিন্তু তা সত্ত্বেও জনসমক্ষে ওই সকল সামাজিক সংগঠনের নেতারা বারবার অরাজনৈতিক শব্দ উচ্চারণ করে এবং পরিশেষে শাসক দলের পক্ষ থেকে নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ পেলে সমাজের কথা ভুলে অর্থের লোভে নিজেকে বিক্রি করে দেয় সেই কারণে এখনও পর্যন্ত স্বাধীনভাবে মন্ত্রিত্ব পদে বসতে পারেনি আবার যদিও কয়েকজন বিধায়ক, সাংসদ, মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছে, তবুও ওদের দলের নিয়ম-নীতি শুধুমাত্র সাঁওতালদের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য গঠিত হয়নি।

সেইজন্য অনেক শুভবুদ্ধি সম্পন্ন সাঁওতালরা সামাজিক সংগঠনের গণ আন্দোলনকে সমর্থন করে এবং সকল প্রকার সহযোগিতা করে। যদিও এখন পর্যন্ত সাঁওতালদের কিছু অধিকার প্রাপ্যের পিছনে গণ আন্দোলনের অবদান রয়েছে তবুও সেক্ষেত্রে রাজনৈতিক মন্ত্রীদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সহযোগকে অমান্য করে সামাজিক সংগঠনের নেতারা নিজেদেরকেই মহান সৈনিক হিসেবে জাহির করে।

এই হলো সাঁওতালদের সামাজিক এবং রাজনৈতিক দুর্বলতার কারণ।

এই দুর্বলতা যদি না থাকতো তাহলে আজকে দেশজুড়ে আদিবাসীদের ওপর অন্যায় অত্যাচার, ঘর বাড়ি থেকে উচ্ছেদ, নিজের চাষজমি থেকে উচ্ছেদ এইসব কিছুই হতোনা। কারণ এখন পর্যন্ত দেখা গেছে আদিবাসীদের বিরুদ্ধে কোনো আইন বা সাংবিধানিক ধারার সংশোধন হলে সবার প্রথমে রাস্তায় বেরিয়ে প্রতিবাদ আন্দোলন করে একমাত্র সাঁওতালরা। বিগত কয়েক বছর থেকে দেখা যাচ্ছে যখন বর্তমান কেন্দ্র সরকার হিন্দু ধর্মের উপর বেশি গুরুত্ব দিয়ে ধর্মীয় শাসনকার্যকে মজবুত করতে শুরু করেছে, ভূমি বিষয়ক আইন বারবার সংশোধন করছে, অরন্যের অধিকার সংক্রান্ত আইনের সংশোধন করছে, শিক্ষাক্ষেত্রে-কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে সামাজিক উন্নয়নের জন্য যে সংরক্ষণ ধার্য  করা আছে তা নির্মূল করার চক্রান্ত করছে, SC ST (Prevention of Atrocities) Act , 13 POINT ROSTER সংশোধন করছে তখন এই ভারতবর্ষে শুধুমাত্র সাঁওতালরাই ব্লক থেকে জেলা, জেলা থেকে রাজপথে প্রতিবাদ করছে এবং অন্যান্য সকল আদিবাসীদের প্রতিনিধিত্ব করছে।





কিন্তু আজকের এই সাঁওতালরা যদি শক, হুন, মোঘল, পাঠান, ইংরেজদের ভয়ে না পালিয়ে বারবার সভ্যতার পরিবর্তন না করতো তাহলে এরা বর্তমানে ঐ মহারাষ্ট্র, গুজরাট, কিংবা বিহারে এবং পূরো গাঙ্গেয় উপত্যকায় শুধুমাত্র সাঁওতাল সভ্যতাই গড়ে উঠত। তখন এই ভারতবর্ষে দেখা যেত না মাটির দেওয়াল ও খড়ের ছাওনির কুঁড়েঘর এবং শুধুমাত্র কৃষিভিত্তিক জীবন যাপন করতে হতো না।

তবুও একদিন নতুন সূর্যের উদয় হবে, সবাই জেগে উঠবে একদিন সবাই বুঝতে পারবে সাঁওতাল যে শুধু এক উপজাতি নয় এটা আন্তর্জাতিক জাতি। কারণ সাঁওতালরা শুধু ভারতে নয় ভারতের বাইরে বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান ইত্যাদি দেশের স্থায়ী বাসিন্দা এবং নিজেদের ভাষা ও সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রেখে জীবনযাপন করছে।

অন্যান্য আদিবাসীদের থেকে সাঁওতালদের ভাষা, ও সংস্কৃতি, ধর্মীয় রীতিনীতি সম্পূর্ণ পৃথক। সাঁওতালদের আছে নিজস্ব বিচারব্যবস্থা যা বিশ্বের সকল দেশের সংবিধান এর পরিপূরক। তাই দাবি করা যায় যে; সাঁওতাল হলো এক স্বাধীন ও আন্তর্জাতিক জাতি। শাসন সুবিধার জন্য যেমন বিভিন্ন জেলাকে বিভাজন করে নতুন জেলা গঠন করা হচ্ছে তেমনই এই সাঁওতালীদের জন্য পৃথক রাজ্য গঠন করা প্রয়োজন। কিন্তু, এই স্বাধীন চিন্তাভাবনা অধিকাংশ সাঁওতালরাই অমান্য করবে । কারণ তারা বর্তমানে বিভিন্ন রাজ্যে, বিভিন্ন ধর্মে, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কারনে বিভাজিত।





তাসত্বেও রচিত হচ্ছে নতুন নতুন ইতিহাস । যেমন বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের আন্দোলনের কারণে সাঁওতালী ভাষাকে ভারতের সংবিধানের ৮ম তপশীলে অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং তারপর সারা ভারতবর্ষের সাঁওতাল অধ্যুষিত এলাকায় সাঁওতালি ভাষায় অফিশিয়াল কার্য সম্পাদনের জন্য অনুমোদন দেওয়া হয় ২০০৮ সাল থেকে পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকারের সহযোগিতায় সাঁওতালি মাধ্যমে লেখাপড়া করার সুযোগ পায় সাঁওতালি ছেলেমেয়েরা। কিন্তু এখন পর্যন্ত শিক্ষার উপযুক্ত পরিকাঠামো গঠন করা হয়নি, বিষয় ভিত্তিক শিক্ষক শিক্ষিকা নিয়োগ করা হয়নি, সাঁওতাল অধ্যুষিত এলাকার সকল বিদ্যালয়ের পঠন পাঠন করানোর জন্য অনুমোদন দেওয়া হয়নি। ২০১১ সালের পর থেকে তৃণমূল সরকার সীমিত সংখ্যক শিক্ষক নিয়োগ করে এবং তারপর গত পঞ্চায়েত নির্বাচনের পূর্বে প্রকাশ করে শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি। কিন্তু শিক্ষক নিয়োগ হয়নি। শুধুমাত্র বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয় সাঁওতাল এলাকায় নির্বাচনে জয়লাভ করার জন্য।

২০১৮ সালে সাঁওতাল ছাত্রছাত্রীরা বিশ্বে সর্বপ্রথম মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছিল ১৬৭ জন পরীক্ষার্থী এবং ৯৪.৬১ শতাংশ হারে উত্তীর্ণ হয় ১৫৮ জন। ঐ বছর সাঁওতালী মাধ্যমে সর্বোচ্চ নম্বর-৫৬৫ পেয়েছিল চাঁদড়া কল্যান সঙ্ঘ হরিজন উচ্চ বিদ্যালয় থেকে অমরদ্বীপ টুডু। ২০১৯ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছিল ২৭৬ জন পরীক্ষার্থী এবং ৯৮.১৯ শতাংশ হারে উত্তীর্ণ হয় ২৭১ জন।

২০১৯ সালে সর্বোচ্চ নম্বর-৫৪৩ পায় বাঁকুড়া জেলার রানীবাধ উচ্চ বিদ্যালয়ের তারাস বেসরা এবং এই বছর ২০২০ সালে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় মোট পরীক্ষার্থী ছিল যথাক্রমে ২৮৩ জন ও ১৪৩ জন এবং মাধ্যমিকে ৯৯.২৯ শতাংশ হারে উত্তীর্ণ হয় ২৮১ জন ও উচ্চমাধ্যমিকে ৯৭.২০ শতাংশ হারে উত্তীর্ণ হয় ১৩৯ জন। ২০২০ সালের সাঁওতালী মাধ্যমের মাধ্যমিক পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর-৫৭৭ পেয়েছে চাঁদড়া কল্যান সঙ্ঘ হরিজন উচ্চ বিদ্যালয়ের বুদ্ধদেব মান্ডী এবং উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর- ৪৪০ পেয়েছে ২০১৮ সালের মাধ্যমিকের প্রথম স্থানাধিকারী অমরদ্বীপ টুডু।

এছাড়াও সাঁওতালি ভাষায় ২০০৫ সাল থেকে বি. এ. শুরু করার পর এম. এ. M. Phil, PhD সবকিছুই পড়ানো হচ্ছে যা হলো এই বিশ্বের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়।