সাঁওতালি মাধ্যমে শিক্ষা কি আজ ঘোর অন্ধকারের মুখে ??

– বিরেন্দ্র নাথ কিস্কু

সাঁওতালি মাধ্যমে আজ ছাত্র ছাত্রীরা উচ্চমাধ্যমিক পাশ করার পরও শিক্ষার সুনিশিত আজও হলো না। আজও সাঁওতালি মাধ্যমের শিক্ষা সেই ঘোর অন্ধকারের মুখে।

দীর্ঘ বার বৎসর পরেও শিক্ষা ব্যবস্থার কোনরূপ পরিবর্তন হয়নি, সেই সূচনা কাল হইতে শত শত বাধা কাটিয়ে আজও চলছে সাঁওতালি মাধ্যমের পড়াশুনা। অনেক অবহেলার পরও কিন্তু আজও সমান তালে এগিয়ে চলেছে অন্যান্য মাধ্যমের সাথে সাঁওতালি মাধ্যমের পড়াশুনা এবং অতি আনন্দের সাথেই ছাত্র ছাত্রীরা নিজের মাতৃভাষায় শিক্ষালাভ করে চলেছে। ভারতের সংবিধানের অষ্টম তফসিলে সাঁওতালি ভাষার অন্তর্ভূক্তি এর পর থেকেই সাঁওতালি মাধ্যমে শিক্ষার জন্য সমাজের সর্ব স্তরের মানুষ একজোট হয়ে বহু আন্দোলনের ফলে পশ্চিমবঙ্গে বার বৎসর পূর্বে সাঁওতালি মাধ্যমের পথ চলা শুরু হয়েছিল, যদিও তারও অনেক আগে থেকেই সাঁওতালি ভাষাকে বিশ্ব দরবারে পৌঁছানোর একটা চেষ্টা চলে আসছিল।

যাইহোক, সাঁওতালি মাধ্যমের মধ্যে পড়াশুনা শুরু হওয়ার পরও এক শ্রেণীর মানুষজন এটাকে নিয়ে হেঁয় করার চেষ্টা করেছিলেন এবং চিরতরে বন্ধ করার একটা চাপা প্রচেষ্টা ছিল, মাঝ পথে মনে হয়েছিল তারা যেন না পেরে হাল ছেড়ে দিয়েছেন কিন্তু না, যখনই ছাত্র ছাত্রীরা উচু ক্লাসের দিকে পা বাড়াতে চলল তখনই দেখা দিল আর এক বাধা , সেটা কিনা “হাতে না মেরে ভাতে মারার মতো ” —-পাঠ্যপুস্তক ও শিক্ষক/শিক্ষিকার জন্য সাঁওতালি মাধ্যমের পড়াশুনা লাটে উঠার মত অবস্থা। কোন রকমে ভুলে ভরা পাঠ্যপুস্তক ( এর জন্য মাননীয় সাঁওতালি ভাষা দরদী সাঁওতাল শিক্ষকগণও সমান দায়ী) ও স্বেচ্ছাসেবক শিক্ষক দিয়ে সাঁওতালি মাধ্যমের পড়াশুনা এগিয়ে চলেছে। বর্তমানে ভাষা বিষয়ের শিক্ষক ছাড়া আর কোন বিষয়ের পূর্ণ সময়ের শিক্ষক/ শিক্ষিকা নিয়োগ হয়নি। গুটিকয়েক পার্শ্ব শিক্ষক শিক্ষিকাদের( সকল বিষয়ের নয়) দিয়ে পড়াশোনা এগিয়ে চলেছে। বর্তমানে যাহার কোনো সুরাহা হয়নি বা সূরাহা করার কোন প্রচেষ্টা বিন্দুমাত্র দেখতে পাওয়া যায়নি। আদ্য প্রান্ত ভুলে ভরা ও অসম্পূর্ণ বই নিয়েই আজকে ছাত্র ছাত্রীরা উচ্চমাধ্যমিকের গণ্ডি পার করে ফেলল। এর সাথে এটাও বুঝতে পারলাম ছাত্র ছাত্রীরা সত্যিই কতটা মেধা সম্পন্ন। আরও একটা মাইল ফলক সংযুক্ত হলো সাঁওতালি মাধ্যমের শিক্ষার মুকুটে। এই কথা ভেবে সত্যিই গর্ব বোধ করি, কিন্তু একবার ভাবুনতো সেই ছাত্র ছাত্রীদের কথা যারা সদ্য উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে নতুন কলেজ জীবনে প্রবেশ করতে চলেছে সাথে শত শত বাবা মায়ের মুখে হাসি ফুটাতে চেয়ে নিজের পছন্দ বিষয় নিয়ে আরো ভালো করে পড়াশুনা করে ভালো রেজাল্ট করে ভবিষ্যতে একটা সুন্দর জীবন কাটাবে , একটা মনের মত চাকরী করবে, তাদের সামনে আজ ঘোর অন্ধকার। তারা আজও জানেনা সাঁওতালি মাধ্যমের জন্য আদৌ কোন কলেজ বন্দোবস্ত হবে কিনা? হলে সেখানে মনের মত বিষয় নিয়ে পড়াশুনা করতে পারবে কিনা? সেখানেও কি কোন রকমের বই ছাড়াই বেদের মত শুনে শুনে মনে রেখেই পড়াশুনা করতে হবে না কি হবে! যদিও সাঁওতালি দের মধ্যে এই শুনে শুনে মনে রাখার ব্যাপারটা অতি প্রাচীন কাল থেকেই চলে আসছে। যেখানে ছাত্র ছাত্রীরা একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির সমস্ত বিষয়ের বই এখনো হাতে পায়নি তাই এ ভাবনা তাদের মনে আসাটা স্বাভাবিক।

পশ্চিমবঙ্গ সরকারের এব্যাপারে সদিচ্ছার সত্যিই অনেক অভাব আছে তাও পরিষ্কার। তা না হলে এটা বলতে হবে যে সমস্ত সাঁওতালি শিক্ষকগণ এই পাঠ্য পুস্তক রচনা করার দায়িত্ব পেয়েছিলেন উনাদের আন্তরিকতার অভাব আছে। আজকে সরকার সাওতালি শিক্ষার ব্যাপারে এতোটা অবহেলা করলে সাঁওতালি মাধ্যমের শিক্ষা কিন্তু ঘোর অন্ধকারের দিকে পা বাড়াবে। যদিও এরকম হলে নিজেদের মধ্যে সমস্ত ইগোকে দূরে সরিয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করতে সাঁওতালি সংগঠন গুলো কিন্তু জানে এবং এটার যে বিহিত হবে সে বিষয়ে নিশ্চিত। কিন্তু কথাটা হল একটা বিষয় নিয়ে সরকার বাহাদুরকে কতবার তেল দিতে হবে? শুধু মাত্র ভোটে জয়ী হওয়ার জন্য নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি জারি করার কৌশল কিন্তু আজ সবাই জেনে গেছে। আজকে সবাই চাইছে সাঁওতালি মাধ্যমে পূর্ণ সময়ের শিক্ষক । যে ছাত্র ছাত্রীরা আগামী দিনের ভবিষ্যৎ তাদের জীবনকে এভাবে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেওয়া একেবারেই অনুচিত এবং এটা দেশকেই অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেওয়ার সামিল বলে মনে করি। আগামী ২০২৫ সাল সাঁওতালি লিপি “অলচিকির” শতবর্ষ পূর্তি হবে তার আগে সাঁওতালি মাধ্যমের এই দশা কিন্তু খুব ভালো নয়। সাঁওতালি ভাষা জানা কলেজ শিক্ষক দেরও এগিয়ে আসা উচিত এই সময়ে যাহাতে কলেজের কার্যক্রম অব্যাহত রাখা যায়। এছাড়াও সরকারের এব্যাপারে এখনই পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত এবং যে যে কলেজে সাঁওতালি মাধ্যমের পড়াশুনা শুরু হবে সেগুলোর নাম অতিসত্বর প্রকাশ করে ছাত্র ছাত্রীদের মনের সব অন্ধকার এখনই দুর করা দরকার।