সাঁওতালি মাধ্যমের শিক্ষা আজ কোন পথে!!!

বিরেন্দ্র নাথ কিস্কু

অতি আনন্দের সহিত এবছর সাঁওতালি মাধ্যমের ইতিহাসে সংযোজিত হলো নতুন মুকুট। এ বছর অর্থাৎ ২০২০ সাল সাঁওতালি মাধ্যমের শিক্ষার ইতিহাস চিরদিন স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে এই গৌরবময় অধ্যায়। তবুও সাঁওতালি ভাষা প্রিয়, সাঁওতালি ভাষা দরদী মানুষজনের মনে কোথায় যেন একটা ‘কিন্তু’ রয়ে যাচ্ছে। সেই ‘কিন্তু এর উত্তর খোঁজার কারনে আজকের এই কলম।

বিগত ১২ বছর ধরে প্রচুর বাধা বিপত্তির মধ্যেও সাঁওতালি মাধ্যমের পথ চলা বন্ধ হয়ে যায়নি, মাঝ পথে ছাত্র ছাত্রীদের কিছুটা অভাব সেই অন্ধকারের প্রতিচ্ছবি কিন্তু সাঁওতালি দরদী মানুষের মনে ফুলকির মতো ঝলক দেখা দিয়েছিল তাও ধীরে ধীরে কাটিয়ে উঠে ২০১৮ সালে পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ থেকে মাধ্যমিক ও ২০২০ উচ্চ মাধ্যমিক সংসদ থেকে অর্থাৎ এবছর উচ্চ মাধ্যমিক খুব ভালো মেধার পরিচয় দিয়ে পাশ করে গেছে। প্রথম থেকে যেমন পাঠ্যপুস্তক ও শিক্ষক শিক্ষিকার অভাব ছিল, বর্তমানেও তাহার কোনরূপ পরিবর্তন হয়নি। এই অবস্থা তো ছাত্র-ছাত্রীদের না যায় প্রমাণ করে দেয় পাঠ্যপুস্তক যতই থাকুক ভুলে ভরা, না থাকুক সমস্ত বিষয়ের শিক্ষক শিক্ষিকা শিক্ষা আমাদের মৌলিক অধিকার তা আমরা অর্জন করবোই। পদ্ম মসজিদ থাকার কারণে আজ উচ্চমাধ্যমিকে সমস্ত বিষয়ের পাঠ্যপুস্তক না থাকার কারণটা ম্লান করে দিয়ে এগিয়ে চলেছে এবং ভবিষ্যতে এভাবেই এগিয়ে যাবে এই আশা করা যায়। ভাবি একবার ভাবুনতো ওই সকল ছাত্র-ছাত্রীদের কথা যারা উচ্চমাধ্যমিকে পাঠ্যপুস্তক না পেয়েও উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে গেল কিভাবে?? নিশ্চয়ই প্রশ্ন আপনার মাথায় আসছে এবং উত্তরটা খুব সহজে পেয়ে গেলেন, কেননা কোন বাংলা মাধ্যমের পাঠ্যপুস্তক পড়ে বা ইংরেজি মাধ্যমের পাঠ্যপুস্তুক পড়াশোনা করে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে গেল এবং সেই সাথে বাংলা মাধ্যমে প্রাইভেট টিউটরের কাছে পড়াশোনা করেছিল। এবিষয়ে কারো সন্দেহ থাকার কথা নয়। এ পর্যন্ত পড়ে আপনার মনে হতে পারে তাতে কি হয়েছে??? ছাত্র-ছাত্রীরা তো সাঁওতালি মাধ্যমেই পরীক্ষায় পাশ করেছে। হ্যাঁ সাঁওতালি মাধ্যমে পাস করেছে। এরপর হচ্ছে সেই কিন্তু র পালা, কেননা সাঁওতালি মাধ্যমে ছাত্র-ছাত্রীরা সমস্ত বিষয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকা ছাড়াই ও সর্বোপরি পাঠ্যপুস্তক ছাড়াই যেভাবে পাশ করে গেল আর কলেজের ক্ষেত্রেও একইভাবে পাস করবে এই ভাবনাটা কি ঠিক? যেখানে পশ্চিমবঙ্গ সরকার উচ্চ মাধ্যমিকের পাঠ্যপুস্তক ছাত্র-ছাত্রীদের হাতে তুলে দিতে পারলোনা, শিক্ষক-শিক্ষিকা বিষয়ভিত্তিক দিতে পারল না, এই অবস্থায় কলেজের পাঠ্য পুস্তক ,অধ্যাপক অধ্যাপিকার কাছে ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনা করার আশা একেবারে নেই বললেই চলে। কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের ভর্তি পড়াশোনা সুনিশ্চিত করার জন্য আদিবাসী সংগঠন আ্যসেকা মাননীয় শিক্ষা মন্ত্রী কে আবেদন জানিয়েছেন অতি শীঘ্র সাঁওতালি মাধ্যমের জন্য কলেজের ব্যবস্থা করার আর্জি জানিয়েছেন। এটা একটা খুবই প্রশংসনীয় পদক্ষেপ এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। মাননীয় আ্যসেকার পদাধিকারী ও সদস্যগন এটাও ভালো করে জানেন যে উনারা যে সমস্ত কলেজে সাঁওতালি মাধ্যমের ছাত্র ছাত্রীদের ভর্তি করার জন্য সকারের কাছে আবেদন জানিয়েছেন সেই সমস্ত কলেজে সাঁওতালি বিষয় অনার্স ও পাশ কোর্স এ পড়াশুনা চলছে আগে থেকেই তাই সেখানে সাঁওতালি বিষয়ের অধ্যাপক পাওয়া যাবে কিন্তু বাকি বিষয়ের ক্ষেত্রে কি অধ্যাপক পাওয়া যাবে? সাঁওতালি মাধ্যমের ছাত্র ছাত্রীরা তো আর সাঁওতালি বিষয় নিয়ে সবাই পড়বে তাতো নয়, যার যে বিষয়ে পড়ার আগ্রহ ও সেই বিষয়ে পড়তে পারে। তাহলে পাঠ্যপুস্তক ছাড়াই ও অধ্যাপক ছাড়াই তারা কিভাবে পড়াশুনা করবে? এখানেও সেই একটাই উপায় যে উপায়ে তারা উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেছে তাহলো বাংলা মাধ্যমের বা ইংরেজি মাধ্যমের পাঠ্যপুস্তক পড়ে ও প্রাইভেট টিউটরের কাছে সাহায্য নেওয়া। এখানে আমার একটা বিষয় বলার আছে তা হল মুক্ত কলেজগুলিতে বিজ্ঞান বিষয় অনার্স বা পাস কোর্সে পড়ানো হয় না তাহলে বিজ্ঞান বিভাগে যে সমস্ত ছাত্র-ছাত্রীরা ভর্তি হতে ইচ্ছুক বা ভর্তি হবে তারা কোন কলেজে ভর্তি হবে? এ বিষয়টিকে আরো ভালোকরে ভাবার প্রয়োজন ছিল। এছাড়াও সাঁওতালি মাধ্যমের ছাত্রছাত্রীরা উক্ত কলেজের পাশাপাশি প্রাইভেট টিউটরের উপর ভরসা করে পড়াশোনা চালিয়ে যাবে তাও তো কলেজগুলির কাছের শহর বাজারগুলিতে পাওয়া নাও যেতে পারে এ অবস্থায় তাদের পড়াশোনার জন্য জেলা শহরগুলোতে যেতে হবে প্রাইভেট টিউটরের জন্য কিন্তু যারা এবছর উচ্চ মাধ্যমিক পাস করল তাদের শতকরা 99 জনের পারিবারিক অবস্থা খুবই সংকটজনক তাই তাদের পক্ষে গাঁটের কড়ি খরচ করে দূরে বাঁকুড়া ঝাড়গ্রাম মেদিনীপুর শহরে প্রাইভেট টিউটরের জন্য না যেতে পেরে মাঝপথে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য হতে পারে। এছাড়াও আরেকটা বিষয় হলো কেন্দ্রীয় সরকারের যে সমস্ত হোস্টেল আছে সে সমস্ত হোস্টেলের কাছাকাছি ছাত্রীদের কলেজের ব্যবস্থা করা গেলে তা খুব ভালো হতো।যেমন বাঁকুড়া জেলার সারদামণি ওমেন্স কলেজ , পুরুলিয়ার নিস্তারিণী কলেজ, ঝাড়গ্রাম রাজ কলেজ ইত্যাদি। যেখানে বাংলা মাধ্যমের ছাত্রছাত্রীরা ভালো কলেজে পড়াশোনা করার সুযোগ পায় সেখানে সাঁওতালি মাধ্যমের ছাত্র-ছাত্রীরা পড়াশোনার সুযোগ না পেলে তাদের মধ্যে একটা মানসিক আঘাত আসবে এর ফলে তারা পড়াশোনা করার আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারে কেননা সাঁওতালি মাধ্যমে যারা রাজ্যে প্রথম 10 জনের মধ্যে স্থান নিয়েছে তাদের ও ভালো কলেজে পড়ার বা শহরের কোন কলেজে পড়ার একটা আশা থাকে। আমরা যদি সরকারের কাছে উক্ত কলেজ গুলির জন্য সাঁওতালি মাধ্যমে পড়াশোনা করার জন্য অনুমতি পায় তাহলে ছাত্র-ছাত্রীদের মুক্ত কলেজগুলোতে ভর্তি হতে হবে এবং এটা একটা জোরপূর্বক বা বাধ্যতামূলক ব্যাপার এর মত। তাই সাঁওতালি দরদী, সাঁওতালি মাধ্যমে শিক্ষার দরদী মানুষজন যারা আছেন তাদের উচিত সরকারের কাছে দাবি রাখা যাতে করে প্রত্যেকটি জেলা শহরের কলেজগুলোতে এই সাঁওতালি মাধ্যমের ছাত্রছাত্রীরা পড়াশোনা করার সুযোগ পায়, তাহার জন্য দাবি জানানো প্রয়োজনে ছাত্র-ছাত্রীদের স্বার্থে পথে নেমে আন্দোলন করতে হবে। এই সমস্ত ছাত্র-ছাত্রীরা ভবিষ্যতে আমাদের স্বপ্নের সাঁওতালি মাধ্যমের শিক্ষাকে পরবর্তীকালে টেনে নিয়ে যাবে, এরাই হলো আমাদের আগামী দিনের পথ প্রদর্শক তাই এসমস্ত ছাত্র-ছাত্রীদের যাতে কোনরূপ পড়াশোনা করার জন্য অসুবিধা না হয় তা দেখার জন্য আমাদের এই এগিয়ে আসা উচিত।