শতবর্ষের দোরগোড়ায় “অলচিকি” লিপি

কলমে:- রিমিল

“অকারণে বৃথাই কেন করো বারণ, সময় চলে আপন খেয়ালে, সময়ের সাথে অগ্রগতি মোদের চলনে।”

দেখতে দেখতে আমরা আজ 95 বৎসরে পা রাখলাম আর পাঁচ বছর পরে পূর্ণ হবে শতবর্ষের। আমরা সেই মহান ঐতিহাসিক বর্ষের দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছি। আর পাঁচ বছর পরেই আসবে সেই মহান বর্ষ অর্থাৎ 2025 সালে পূরণ হবে সাঁওতালি ভাষার জন্য প্রথম লিখিত বর্ণমালা অলচিকি হরফ এর। একটা সময় ছিল যখন সাঁওতালি ভাষাতে পঠন পাঠন করার জন্য কোন সুযোগ-সুবিধা বা সাঁওতালি ভাষায় রচিত কোন পাঠ্যপুস্তক ছিল না। নিজের মাতৃভাষায় লেখাপড়া করার যে একটা সুবিধা সেটা বুঝতে পেরেছিলেন পন্ডিত রঘুনাথ মুরমু মহাশয়। অন্য কোন লিপিতে সাঁওতালি ভাষা লিখিত আকারে সঠিকভাবে প্রকাশ করা যায় না তা বলাই বাহুল্য। সাঁওতালি ভাষা লিখিত আকারে প্রকাশ করার জন্য একটা স্বতন্ত্র লিপির প্রয়োজন ছিল। এছাড়াও এই পৃথিবীতে সাঁওতালি ভাষাকে টিকিয়ে রাখতে গেলে নিজস্ব মাতৃভাষার মত নিজস্ব একটা দরকার ছিল । এই সমস্ত কিছু সুবিধার্থে এবং মাতৃভাষায় পড়াশোনা করার জন্যই পন্ডিত রঘুনাথ মুর্মু 1925 সালে “অলচিকির” সৃষ্টি করেছিলেন। আজ আমরা উনার সৃষ্টি করা লিপির মাধ্যমে সাঁওতালি ভাষায় পাঠ্যপুস্তক রচনা থেকে সাহিত্য চর্চা ইত্যাদি করে থাকি। এই “অলচিকি” হরফকে জনসাধারণের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য নিজ হাতে ছাপাখানা তৈরি করে ও বই ছেপে তা প্রসারে জোর দিয়েছিলেন পন্ডিত রঘুনাথ মুরমু মহাশয়। এই “অলচিকি” লিপিতে মুদ্রিত প্রথম বই হল “বিদু চাঁদান” 1942 সালে বাংলা “অলচিকি” দুইটি হরফে ছাপা হয়েছিল ,উক্ত বছরেই “অল চেমেদ”ও “অল উপরুম” বই দুটি লেখেন পন্ডিত রঘুনাথ মুরমু।





আজকে অনেক বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে এগিয়ে চলেছে স্বমহিমায় “অলচিকি “লিপি। এই “অলচিকি” লিপি যে বিজ্ঞানসম্মত তা একবাক্যে সবাই মেনে নেন কিন্তু “সুন্দর সে যতই হোক বিশ্রী বলার লোক তো থাকবেই” সেইরুপ, অনেকেই “অলচিকি” লিপির গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছিলেন। উনারা “রোমান” হরফে সাঁওতালি তে লেখাপড়া চালু করার জন্য একটা প্রচেষ্টা করেছিলেন এবং তাতে উনারা কিছুটা সফলও হয়েছিলেন। এখনো এই “রোমান” হরফে সাঁওতালি ভাষা চর্চার করার একটা প্রচেষ্টা আছে কিন্তু “অলচিকি” লিপিতেই যে একমাত্র সাঁওতালি ভাষা লিখিত ভাবে প্রকাশ করা যায় তা অন্য কোন ভাষার লিপিতে সম্পূর্ণ রূপে প্রকাশ করা অসম্ভব। সাঁওতালি ভাষার নিজস্ব লিপি “অলচিকি”র শতবর্ষ উদযাপনের জন্য বা স্বাগত জানানোর জন্য সাঁওতালি ভাষা দরদী মানুষজনের মধ্যে অন্য আবেগ, অনুভূতির ঢেউ খেলে যাচ্ছে। শতবর্ষকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য নানারকম কর্মসূচির বাস্তবায়নের জন্য এখন থেকে প্রস্তুতি চোখে পড়ার মতো।





2003 সালের 22 শে ডিসেম্বর ভারতের” অষ্টম তফসিলে” সাঁওতালি ভাষা অন্তর্ভুক্তি হওয়ার পর 2005 সাল থেকে “সাহিত্য একাডেমী” নিউ দিল্লি ,সাঁওতালি ভাষায় রচিত সাহিত্যকর্মের জন্য পুরস্কার চালু করেছে। এই পুরস্কারের জন্য সাঁওতালি সাহিত্যচর্চা দ্বিগুণ গতিবেগ পেয়েছে একথা কিন্তু মানতেই হবে। নিত্যনতুন লেখক ও কবি এর আবির্ভাব তারই ইঙ্গিত বহন করছে। এখনতো সাঁওতালি সাহিত্য চর্চা করার জন্য লেখক, কবিগণ বই, খাতা, ডায়েরি তুলে রেখে “ফেসবুক” সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে নিজের লেখনশৈলী তুলে ধরতে বেশি মাত্রায় উৎসুক থাকেন। এই ফেসবুক সোশ্যাল মিডিয়া থেকে নিত্যনতুন অনেক লেখক ও কবির সন্ধান পাওয়া যায়। যারা কিনা বই ছাপা করার থেকে ফেসবুক কেই বই হিসাবে ব্যবহার করতে পছন্দ করেন । যারা অন্য লেখকের ছাপা বই পড়ার জন্য কোন সময় পান না, উনারাই আবার ফেসবুকে ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দেন। তবু বলব এই ফেসবুক মিডিয়ার মাধ্যমে সাঁওতালি সাহিত্য চর্চা খুব জোরদার ভাবেই চলছে। তার সাথে সমান তালে চলছে সাঁওতালি মাধ্যমের পঠন-পাঠন ও ” মিশন অলচিকি 2025″- এর কর্মযজ্ঞ। এই মিশনের এক এবং অদ্বিতীয় উদ্দেশ্য হল সাঁওতালি ভাষার প্রসার ও সাঁওতালি ভাষা শিক্ষার ক্ষেত্রে অলচিকি লিপিতে 100% স্বাক্ষর করে তোলা। এই উদ্দেশ্যে বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ায় জোরদার প্রচার ও “অল চিকি” তে পাঠদানের উপর জোর দেওয়া হচ্ছে যাতে 2025 সালের মধ্যে সাঁওতালি ভাষার ক্ষেত্রে অলচিকি লিপির ব্যবহার 100% নিশ্চিত করা যায়। এটা একটা খুবই প্রশংসনীয় পদক্ষেপ এতে কোন সন্দেহ নেই।





কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে “মিশন অল চিকি 2025” অধরাই থেকে যাবে ও তাহার পরিপূর্ণ স্বাদ পেতে আমাদের হয়তো আরো অনেক বছর অপেক্ষা করতে হবে। কেননা এই অল চিকি লিপিতে সাঁওতালি ভাষা চর্চা ও প্রচারে যাদের ভূমিকা অগ্রগণ্য বলে মনে করা হয় সেই সমস্ত লেখক, কবি ,গীতিকারগণ সাঁওতালি ভাষায় সাহিত্য চর্চার জন্য “অলচিকি” নয় অন্য কোন দ্বিতীয় ভাষার অবলম্বন করছেন যেমন উড়িষ্যাতে “ওড়িয়া” আসামে “অসমীয়া” পশ্চিমবঙ্গে “বাংলা” ঝাড়খন্ড ও বিহারে “দেবনাগরী” লিপিতে সাহিত্য চর্চা করতে বেশি অভ্যস্ত ও ভালো মনে করেন বলেই মনে হয়। এছাড়াও ফেসবুক, হোয়াটঅ্যাপস ছাড়াও অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়ায় সাঁওতালি ভাষায় লেখার জন্য অলচিকি লিপির ব্যবহার করা গেলেও তা কিন্তু অনেকেই যত্নসহকারে এড়িয়ে যান অদ্বিতীয় ভাষাতেই লেখালেখি বা কোন কিছুর উপরে পোস্ট করতে পছন্দ করেন। এর থেকেও আরও একটা উদ্বেগের বিষয় হলো যে সমস্ত সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীগণ আছেন উনাদের মধ্যে যারা অলচিকি লিপি দরদী মানুষজন আছেন উনারা নিজের লেখা গুলো অলচিকি লিপিতে পোস্ট করে থাকেন। এই লেখাগুলো যতই সুন্দর ও তথ্য সমৃদ্ধ হোক না কেন সে সমস্ত পোস্টগুলোকে সন্তর্পনে এড়িয়ে চলতেই সবাই এখন অভ্যস্ত এবং দিনের শেষে দেখা যায় একটা লাইক বা কমেন্ট ও জমা পড়ে না কিন্তু উক্ত লেখাটি আবার দ্বিতীয় কোন হরফে লেখা হলে লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার করার বন্যা বয়ে যায়। এর থেকেই স্পষ্ট বোঝা যায় মুখে যতই আমরা বলি না কেন সাঁওতালি ভাষা মোদের মাতৃভাষা, অলচিকি লিপি মোদের গর্ব কিন্তু আমরা তার ব্যবহার 5% করি কিনা সন্দেহ আছে।





“মাতৃভাষা মাতৃদুগ্ধ সমান”- এই কথাটা অন্য ভাষার ক্ষেত্রে যথার্থ মনে হলেও সাঁওতালি ভাষার ক্ষেত্রে এই একবিংশ শতাব্দীতে এসে মনে হয়না যথার্থ হবে। তাইতো এখনও সেরকম ভাবে কোনো পত্রপত্রিকা অলচিকি লিপিতে ছাপা হয় না। যে কয়েকটি ছাপা হয় তা উক্ত পত্রিকার সম্পাদকের সাঁওতালি ভাষা প্রীতির জন্য সম্ভবপর হচ্ছে। এছাড়াও এই একবিংশ শতাব্দীতে এসে সাঁওতালি ভাষা জানা মানুষ জন প্রযুক্তিতে এগিয়ে চলেছে তবুও এখনো সেরকম একটা সাঁওতালি ভাষায় ওয়েবসাইট দেখতে পাওয়া যায় না। হাতেগোনা দুটি বা তিনটি ওয়েবসাইট বর্তমানে দেখতে পাওয়া যায় ,যাতে প্রতিনিয়ত নিত্যনতুন খবর ও নতুন নতুন লেখকের সাহিত্য চর্চা দেখতে পাওয়া যায়। বহুল পরিচিত ও স্বনামধন্য যে সমস্ত পত্রপত্রিকা ও ওয়েবসাইট সাঁওতালি সাহিত্য চর্চার জন্য আছে তাও কিন্তু অন্য দ্বিতীয় লিপির মাধ্যমে সাঁওতালি ভাষা প্রকাশ করা হয়।





পরিশেষে এটাই বলব এখনকার ছাত্রছাত্রীরা যারা সাঁওতালি মাধ্যমে পড়াশোনা করছে শুধুমাত্র তারাই অলচিকি লিপিতে পাঠ্যবই পড়াশোনা করছে এবং তারাই হল একমাত্র সাঁওতালি ভাষা দরদী। তারা এক অনিশিত ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে চলেছে, কুর্নিশ তাদের জানাতেই হয় এবং তার সাথে তাদের প্রিয় অভিভাবক অভিভাবিকাদের । এই অলচিকি লিপির শতবর্ষ কেমন হবে বা সাঁওতালি ভাষাকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরার জন্য আমাদের নিঃস্বার্থভাবে এগিয়ে আসা দরকার। সে সমস্ত সম্পাদক মহাশয় পত্রপত্রিকা বা ওয়েবসাইটে যারা প্রতিনিয়ত অলচিকি লিপির প্রচারের জন্য সচেষ্ট তাদের পাশে আমাদের থাকা একান্তই উচিত।