বিশ্ব আদিবাসী দিবস ও বর্তমান আদিবাসী সমাজ

আজ ৯ই আগস্ট বিশ্ব আদিবাসী দিবস। বিশ্বের আদিবাসী জনগণের অধিকার সংরক্ষণ এবং সচেতনতা বাড়াতে প্রতি বছর ৯ই আগস্ট বিশ্ব আদিবাসীদের আন্তর্জাতিক দিবস পালন করা হয়। এই ইভেন্টটি পরিবেশ সংরক্ষণের মতো বিশ্বের সমস্যাগুলি উন্নত করতে আদিবাসীদের কৃতিত্ব ও অবদানকে স্বীকৃতি দেয়। ১৯৯৪ সালের ডিসেম্বর মাসে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশন কর্তৃক এটি প্রথম উচ্চারিত হয়েছিল। সারা বিশ্বের আদিবাসীরা আজকের দিনটা খুব উৎসাহের সঙ্গে পালন করে আসছে। আদিবাসী বলতে কাদের বোঝায় বা আদিবাসী বলতে আমরা কাদের বলব? আদিবাসী কারা এটা এক কথায় প্রকাশ করা বা বলা সম্ভব নয় জাতিসংঘ একটা কার্যকরী সংজ্ঞা বলেছিলেন তা হল, ”আদিবাসী জনগোষ্ঠী জাতি এবং জাতি গুলি হল,যেগুলি প্রাক আগ্রাসন এবং প্রাক-ঔপনিবেশিক সমাজগুলোর একটি ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা যা তাদের অঞ্চলগুলিতে বিকশিত হয়েছিল,সে অঞ্চল গুলিতে তাদের কিছু অংশে বিরাজমান সমাজের অন্যান্য খাত থেকে নিজেকে আলাদা মনে করে। তারা বর্তমানে সমাজের অপ্রভাবসালী খাত গঠন করে এবং তাদের নিজস্ব সংস্কৃতির নিদর্শন অনুসারে জনগন হিসেবে তাদের অবিচ্ছিন্ন অস্তিত্বের ভিত্তি হিসেবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে তাদের পূর্বপুরুষের অঞ্চল এবং তাদের জাতিগত পরিচয় সংরক্ষণ, বিকাশ এবং সংক্রমণে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা,সামাজিক প্রতিষ্ঠান এবং আইনি ব্যবস্থার মাধ্যমে।”





অর্থাৎ বলা চলে উন্নত সভ্যতার গঠন হওয়ার পূর্বে যে সমস্ত জাতি বসবাস করত যাদের নিজস্ব ভাষা, ধর্ম, সংস্কৃতি অন্যদের চেয়ে অনেক আলাদা ও স্বতন্ত্র, যারা নিজের সমাজের অস্তিত্ব রক্ষায় দৃঢ় প্রতিজ্ঞ এবং উন্নয়নশীল সমাজের থেকে অনেক দূরে, জল জঙ্গল,পাহাড়ে যাদের বাস তাদের কেই আমরা আদিবাসী বলতে পারি। এই আদিবাসীরা হলো দেশের একমাত্র আদিম অধিবাসী। আজকের আধুনিক সমাজের জনক সেই আদিবাসী,যাদের নিজস্ব অর্থায়নে পরিচালিত হয় নিজের সংস্কৃতি,ধর্ম,পূজা পার্বণ। বন জঙ্গল যাদের প্রাণ, এই প্রকৃতি তাদের দেব স্থান, যারা হলেন প্রকৃতির পূজারী তারাই হলো আদিবাসী। এই আদিবাসীরা যুগ যুগ ধরে নানা রকম ভাবে শোষিত, বঞ্চিত,নিপীড়িত এক জাতি। যাদের কে বার বার করে তাদের বাসস্থান পাল্টাতে হয়েছে অত্যাচারী শাসকের জন্য। এই আদিবাসীরা আজকের দিনও শোষিত, বঞ্চিত, নিপীড়িত এক জাতি। পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই আদিবাসীদের বসবাস দেখাযায় কমবেশী।





আমাদের ভারত বর্ষে ১০ মিলিয়নের চেয়েও বেশি আদিবাসী বসবাস করছেন। এই আদিবাসীদের মধ্যে আবার অনেক জাতি আছে যাদের ভাষা, ধর্ম, সংস্কৃতি ভিন্ন ভিন্ন । সাঁওতাল জাতি তার মধ্যে এক উন্নত আদিবাসীদের মধ্যে একটা জাতি। যাদের মাতৃ ভাষায় শিক্ষালাভ এর সুযোগ আছে। আদিবাসী সম্প্রদায় গুলি ইতিমধ্যে প্রচুর বাধার সম্মুখীন হয়েছে এবং দুর্ভাগ্যজনক বর্তমান বাস্তবতার ই হচ্ছে যে COVID-19 এর প্রভাব এখন এ বাধাগুলোকে আরও কঠিন করে তুলেছে। আদিবাসী সম্প্রদায়় গুলো ইতিমধ্যে স্বাস্থ্যসেবা গুলিতে সঠিক পরিষেবা থেকে বঞ্চিত,রোগের উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধির হার, প্রয়োজনীয় পরিষেবা গুলোর অভাব স্যানিটেশন এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা যেমন পরিষ্কার জল জীবাণুনাশক ইত্যাদি। এমনকি আদিবাসীরা যখন স্বাস্থ্যপরিসেবা পেয়ে থাকে তখনো তাদের বিভিন্ন অপমানজন ও বৈষম্যের শিকার হতে হয়। মূল বিষয় হলো আদিবাসীদের নির্দিষ্টট পরিস্থিতির জন্য উপযুক্ত হিসাবে আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় আদিবাসী ভাষায় পরিষেবা এবং সুযোগ-সুবিধা সরবরাহ নিশ্চিত করা। এছাড়াও শিক্ষাক্ষেত্রে আদিবাসীদের সমস্ত রকম সুযোগ-সুবিধা দেওয়া যাতে তারা নিখরচায় শিক্ষা লাভ করে তাদের জাতিকে উন্নয়নের মূল স্রোত এ নিয়ে আসতে পারে তার জন্য সকারের সদিচ্ছা থাকতে হবে।





এছাড়াও আদিবাসী যাতে মাতৃভাষায় পড়াশোনা করতে পারে তার ব্যবস্থাাা করা প্রয়োজন। আদিবাসীরা প্রায় সকলেই অসংগঠিত ক্ষেত্রে কাজ করে তাদের সংসার চালান। অনেক ক্ষেত্রে মহিলারা সংসারেেের হাল ধরেন। বন থেকেে শুকনো কাঠ পাতা আরোহন করে রোজগার করেন। ভারতবর্ষে অরণ্যযবাসী আদিবাসীদের অরণ্যের অধিকার আইন ২০০৬ কে সংশোধন করার মাধ্যমে আদিবাসীদের জীবনযাত্রাকে এক চরম সংকটের মুখে ঠেেলে দেওয়া হয়েছে। সাঁওতাল পরগনা টেনান্সি অ্যাক্ট ছোটনাগপুর টেনান্সি অ্যাক্ট বাতিল করার মাধ্যমে সাঁওতাল তথা আদিবাসীদের জমির উপর সরকার থাবা বসাতে চলেছে। বড়় বড় শিল্পপতিদের হাতে অরণ্যের অধিকার তুলে দিয়ে অরণ্য ধ্বংস করার একটা চক্রান্ত চলছে। সরকার আদিবাসীদের সংগঠিত ক্ষেত্রে কাজ দেওয়া ও অরণ্যের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে আদিবাসীদের প্রকৃত উন্নয়ন করার জন্য সচেষ্ট হতেে হবে। ভারতবর্ষে বিভিন্ন ভাষাভাষী আদিবাসী মানুষজন থাকলো সবাই কিন্তুুুু তাদের মাতৃভাষায় পড়াশোনা করার সুযোগ পায় না।





2003 সালের 22 শে ডিসেম্বর ভারতবর্ষের সংবিধানের অষ্টম তফসিলেে সাঁওতালি ভাষাা অষ্টম তফসিলে অন্তর্ভুক্তি হওয়ার দীর্ঘদিন পর সাঁওতালি ভাষায়় পড়াশোনা চালু হয়েছে। বহু বঞ্চনার মধ্যে আজ এগিয়ে চলেছ। এই বার প্রথম উচ্চমাধ্যমিক পাশ করার পর কলেজে ভর্তি হওয়ার জন্য এখনো পর্যন্ত শুধুমাত্র একটি কলেজে দুটি বিষয়ের উপর অনার্স কোর্সে পড়ার জন্য অনুমোদন পেয়েছি। কিন্তুুু দুর্ভাগ্যের বিষয়় যখন অন্যান্য মিডিয়ামেের ছাত্র ছাত্রীরা আগামীকাল থেকে কলেজে ভর্তি হওয়ার জন্য অনলাইনে ফরম ফিলাপ শুরু করবে কিন্তু সাঁওতালি মিডিয়াম ছাত্র-ছাত্রীদের এখনো পর্যন্ত কলেজের নাম ও জানানো হলো না। জানিনা এভাবেে কি সরকার ভারত বর্ষ থেকে আদিবাসীদের চিরতরে মুছেে ফেলতে চায়? কিন্তু না, সরকার শত চেষ্টা করেও কিন্তুুু আদিবাসীদের অস্তিত্ব মুছে ফেলতে পারবে না। এই আদিবাসীরাই একদিন ইংরেজদের গোলাবারুদের সামনে ভারতবর্ষকে স্বাধীন করার জন্য বুক চিতিয়ে আন্দোলন করেছিলেন। একথা গর্বব করে বলতে বলতেে পারি ১৮৫৫ সালে হুল বিদ্রোহ সংগঠিত না করলে ভারতবর্ষের অন্যান্য জাতি ইংরেজদের হাত থেকে স্বাধীনতা পাওয়ার জন্য আন্দোলনের কথা ভাবতেও পারতেন না। সেই আদিবাসীদেের অস্তিত্বকে অস্বীকার করা একটা ঐতিহাসিক ভুল হবেই এবং তার জবাব কড়া হাতেই করা হবে। (সংক্ষিপ্ত)