বিশ্ব আদিবাসী দিবস : এক প্রহসন মাত্র

– এম. নেপোলিয়ন টুডু

আদিবাসীদের অস্তিত্ব রক্ষা ও অধিকার অর্জনের লক্ষ্যে ,  রাষ্ট্রসংঘ 9 আগস্ট কে বিশ্ব আদিবাসী দিবস হিসাবে ঘোষণা করেছিল। মূল লক্ষ্য ছিল শিক্ষা, স্বাস্থ্য সহ সর্বোপরি আদিবাসীদের সার্বিক উন্নয়ন। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আদিবাসী দিবস পালনের এত বছর পরেও আদিবাসীরা যে তিমিরে ছিল তারা আছে সেই তিমিরেই। আদিবাসীদের উপর শোষণ,বঞ্চনা লাগামহীনভাবে বেড়েই চলেছে। আজ আদিবাসীদের মাতৃভাষায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সংস্কৃতি গভীর সংকটে। তাদের মৌলিক অধিকার থেকে তারা শতহস্ত দূরে।

রাষ্ট্রসঙ্ঘের ঘোষণা অনুযায়ী পেরিয়ে গেছে আদিবাসী দশক। গতবছর পেরিয়ে গেছে আদিবাসী ভাষা বর্ষ। কিন্তু আজ কোথায় আদিবাসীদের অধিকার? ঠিক কোন জায়গায় দাঁড়িয়ে আদিবাসী গোষ্ঠীর ভাষাসমূহ? একটু খোঁজ নিলেই  পাওয়া যাবে, আদিবাসীদের ভাষা ও আদিবাসীদের অধিকারের এক গভীর সংকটময় অবস্থার কথা।





ইদানিং আদিবাসী দিবস নিয়ে একটু  বেশি করেই মত্ততা দেখা দিচ্ছে। কিছু কিছু জায়গায় সরকারিভাবেও আদিবাসী দিবস পালিত হচ্ছে। কিন্তু সেগুলো শুধু লোক দেখানো ছাড়া আর কিছু নয়! সরকারের নিজস্ব প্রচারের সীমাহীন ক্ষেত্রতে পরিণত হয়েছে। নাচ-গানের আয়োজন, দু-একটা সম্বর্ধনা সাথে ভাষণের ফুলঝুরি। এইভাবে  আদিবাসীদের সার্বিক উন্নয়ন কতটা সম্ভব, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।

আদিবাসীদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন বিষয়ে দূত পাঠানো হয়েছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সেই বিষয়টিকেই সর্বতোভাবে উপেক্ষা করা হচ্ছে। যেমন এ বৎসর উড়িষ্যা থেকে এক খারিয়া আদিবাসী গবেষক ছাত্রীকে পরিবেশ রক্ষার বিষয়ে বক্তব্য রাখার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হলো। অপরদিকে সেইসব এলাকাতেই আদিবাসীদের কাছ থেকে বন জঙ্গলের অধিকারকে সম্পূর্ণভাবে ছিন্ন করা হচ্ছে। যথেচ্ছভাবে গাছ কাটার মহাসমারোহ চলছে। নেই কোনো রূপ প্রশাসনিক ভ্রুক্ষেপ, প্রশাসনের বিন্দুমাত্র তৎপরতা । এতে করে পরিবেশের কি ক্ষতি হতে পারে কিংবা আদিবাসীদের অবস্থা কি হতে পারে, এই দায় যেন  তাদের চিন্তার বাইরে।





তাই এই করোনা পরিস্থিতিতে, পৃথিবী যখন  ভয়ঙ্কর সংকটময় অবস্থার মুখোমুখি ; তখন আদিবাসীদের নিয়ে এরকম ছেলেখেলা কেন? তাদের জাতিগত মৌলিক দর্শনের কথা চিন্তা করা হবে না কেন? তাদের প্রকৃতিনির্ভর জৈবিক সহাবস্থানকে ধ্বংস করা হবে কেন? এরকম হাজারো প্রশ্নের সম্মুখীন আমরা।

যদি সত্যি করেই আদিবাসীদের অস্তিত্বকে, পরিচয়কে টিকিয়ে  রাখার জন্য এই চিন্তা ভাবনা, তাহলে আজ তাদের এই অবস্থা কেন? রাষ্ট্রসঙ্ঘের পক্ষ থেকে আদিবাসীদের জন্য আর্থিক ঘোষণা নেই কেন? সারা বছরের কর্মসূচির ছিটেফোটাও দেখা যায় না কেন? শুধু কি একটা দিন পালন করলেই আদিবাসীদের সব সমস্যার সমাধান হবে? নাকি এর পিছনেও লুকিয়ে আছে কিছু গুঁড় রহস্য ?





আজ এই অবস্থায় দাঁড়িয়ে অবশ্যই ভাববার সময় এসেছে। কিছু বলবার সময় এসেছে, হাতে কলম নিয়ে লিখার সময় এসেছে। না হলে বছরের পর বছর আদিবাসী দিবস পালন করে গেলেও আদতে কোন উন্নয়ন  ধরা দেবে না। আদিবাসীরা শুধু নাচবে গাইবে, তাদের নাচ-গান ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় প্রদর্শিত হবে। কিন্তু লাভের লাভ তাদের কিছুই হবে না।  

তাই এই পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, বিশ্ব আদিবাসী দিবস প্রহসন ছাড়া আর কিছু নয়।এই ছলনা যেন অবিলম্বে বন্ধ হয়।পৃথিবীর প্রতিটি  রাষ্ট্রের প্রত্যেক রাষ্ট্রপ্রধানদের একটি কথা অবশ্যই মনে রাখতে হবে ____
“যারে তুমি নিচে ফেল সে তোমারে বাঁধিবে যে নীচে,
পশ্চাতে রেখেছ যারে সে তোমারে পশ্চাতে টানিছে ;
অজ্ঞানের অন্ধকারে
আড়ালে ঢাকিছ যারে ;
তোমার মঙ্গল ঢাকি গড়িছে সে ঘোর ব্যবধান
অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান” ।

                       ______*****______





Rating: 1 out of 5.