ডক্টর অমরনাথ ঝাঁ উচ্চ বিদ্যালয়ের আদর্শ শিক্ষক স্বর্গীয় অসিত বরন মান্ডির স্মৃতিচারণায় কিছু কথা ও কাহিনী

2002 সাল থেকে 2010 সাল 8 বছর ওই ডক্টর অমরনাথ ঝাঁ উচ্চ বিদ্যালয়ের পঞ্চম থেকে দ্বাদশ আমার পড়াশোনা। ঐ সময় ডক্টর অমরনাথ ঝাঁ উচ্চ বিদ্যালয়ে যে চারজন ইংরেজির শিক্ষক ছিলেন তার মধ্যে মান্ডি বাবু একজন।

মান্ডি বাবুকে নিয়ে স্মৃতিকথা লেখার আগে অন্য আরেকটি কথা বলি। বর্তমানে আমি কেন্দ্রীয় জল আয়োগের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মী। প্রথম জয়নিং হয়েছে 2015 সালের আগস্ট মাসে ব্রাহ্মনি সাব-ডিভিশন, রাওরকেলার অধিনে। অফিস ঝাড়খন্ডের সিমডেগা জেলাতে। বর্তমানে স্থানান্তর হয়ে আছি ওডিসার দেওগড় জেলাতে।

2015 সালের দীপাবলিতে যখন বাড়ি যাচ্ছি তখন জামশেদপুরের মানগো বাসস্ট্যান্ড থেকে একটি মিনিবাস করে বান্দোয়ান যাবার জন্যে উঠে দেখলাম বাসটি প্রচুর ভিড়। বাসের ভেতর দিকে একটি সিটের পাশে দাঁড়ালাম। সিটে বসে আছেন দুইজন বয়স্ক স্বামী-স্ত্রী। বাস চলতে শুরু করার পর বৃদ্ধটি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ”বাবু কোথায় যাবে?” আমি বললাম, ”রানিবাঁধ।” উনি আবার জিজ্ঞেস করলেন, ”কোথা থেকে আসছ?” বললাম ”ঝাড়খণ্ডের সিমডেগা থেকে”। আবার জিজ্ঞেস করলেন, কী কাজ করো? বললাম, ”সেন্ট্রাল ওয়াটার কমিশনের গ্রুপ ডি তে কাজ করি।” তারপরে উনি বললেন সে যাই হোক সেন্ট্রাল এর কাজ তো তাহলে ভালই। তারপরে জিজ্ঞেস করলেন, ”পড়াশোনা কোথায় করেছো?” বললাম, ”ডক্টর অমরনাথ ঝাঁ হাইস্কুলে।” তারপর উনি বললেন, ”আর কিছুই জিজ্ঞেস করবোনা।” ওনারা আরো জানালার দিকে সরে গিয়ে আমাকে বসতে বললেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ”কেন কিছু জিজ্ঞেস করবেন না?” উনি বললেন, ”তুমি ডক্টর অমরনাথ ঝাঁ উচ্চ বিদ্যালয়েতে পড়াশোনা করেছ তার মানে তুমিও ভালোছেলে ছিলে তাই আজ এত তাড়াতাড়ি চাকরি পেয়েছো ।ওই সময় আমি ওনাকে আমার আগের চাকরির কথাটাতো বললাম না তবু উনি আবার জিজ্ঞেস করলেন, ”তাহলে কোন বছর উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেছো?” বললাম, ”2010 সালে।” তারপরে বললেন, ”তাহলে আমাদের আকরোঁর নিরুপমাকে জানো?” বললাম, ”হ্যাঁ, আমরা একসঙ্গে পড়েছি।” তারপর আরো অনেক গল্প হল…।

এরপরে আসি আসল কথায় ঐ যে বয়স্ক বৃদ্ধটি আমাকে বললেন, ”তুমি ডক্টর অমরনাথ ঝাঁ উচ্চ বিদ্যালয়েতে পড়াশোনা করেছ তার মানে তুমিও ভালোছেলে ছিলে” এই কথা শুনে কতযে স্কুল কে নিয়ে গর্ববোধ করেছি তা কারো কাছে প্রকাশ করিনি। আজ লিখে প্রকাশ করলাম। 2015 সাল পর্যন্ত আমার সাথে ইন্টারনেট এর সম্পর্ক ছিলনা তাই ডক্টর অমরনাথ ঝাঁ উচ্চ বিদ্যালয়ের রেজাল্ট বন্ধুদেরকে ফোন করে জিজ্ঞেস করতাম কিন্তু এখনতো কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ফেসবুকে দেখতে পাচ্ছি আজ 10:07 সময়ে আমাকে ফেসবুকের একটি লিংক বন্ধু সুকুমার পাঠালো। সঙ্গে সঙ্গে লিংকে ক্লিক করার পর দেখলাম ”আমাদের মাঝে আর নেই মান্ডি বাবু।”

সঙ্গে সঙ্গে সুকুমারকে জিজ্ঞেস করলাম, ”মান্ডি বাবুর কি হয়েছিল?” বলল, ”জানিনা।” তারপর ফোন লাগালাম বন্ধু প্রনয়ের ভাই গৌতমকে। তখন ও কারোর সাথে কথা বলছিল।

তারপরে ফোন লাগালাম বন্ধু কাজলকান্তকে। সেও তখন কারোর সাথে কথা বলছিল। আধঘন্টা পরে গৌতম আমাকে ফোন করে জানালো যে, গতকাল রাতেই দুর্গাপুরের এক হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। কিডনি খারাপ হয়েছিল।

তারপরে কাজলকান্ত আমায় ফোন করে সে বলল, অনেকে অনেক রকম বলছে লিভার, কিডনি কিছু একটা খারাপ হয়েছিল।

যাইহোক কোন কারণে আজ আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন মান্ডি বাবু।

মান্ডি বাবু যে 2002 থেকে 2010 সাল পর্যন্ত টানা আট বছর আমাকে পড়িয়েছেন তা কখনো ভুলতে পারবোনা আজ যেমন আমি দিনের সারাক্ষণ অফিসে থাকতে ভালোবাসি সেই রকম উনিও সকাল ছয়টা থেকে সন্ধ্যা সাতটা-আটটা পর্যন্ত বিদ্যালয়ে থাকতেন। ইংরেজিতে আগ্রহী ছেলেমেয়েদেরকে কোচিং ক্লাস করাতেন; বিনা পয়সায়। আমিও পড়েছি, কিছুটা হলেও ইংরেজি শিখেছি ওনার কাছ থেকে। উনার ক্লাস সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য শুধু মজার ক্লাস হয়ে থাকত আর আমাদের জন্য ছিল মহামূল্যবান।

বিদ্যালয়ের যে কোন অনুষ্ঠানে উনার একটি বড় মাপের খাতা দেখে দেখে উনি যেসব বক্তব্য ইংরেজিতে উপস্থাপন করতেন তার সবকিছু আমি বুঝতাম না। শুধু শেষের কথাটা ভাল করে বুঝতাম কারন শেষে বাংলায় বলতেন, ”শিক্ষা আনে চেতনা, চেতনা আনে বিপ্লব, বিপ্লব আনে মুক্তি।

যেহেতু আমি সাঁওতাল। মান্ডি বাবুও সাঁওতাল। তাই বিদ্যালয়ের একমাত্র সাঁওতাল শিক্ষক হওয়ার সুবাদে আমি উনাকে অনুসরণ করলাম এবং বিশ্বশান্তিতে অনুপ্রাণিত হলাম। তাই আমিও সাঁওতালিতে লেখালেখি শুরু করলাম ওই ক্লাস নাইন থেকে।

মান্ডি বাবু বিদ্যালয়ের অনুষ্ঠানে যে সকল বক্তব্য উপস্থাপন করতেন সেগুলো হয়তো এখনো পুস্তক আকারে প্রকাশিত হয়নি। তাই আশা রাখবো ডক্টর অমরনাথ ঝাঁ উচ্চ বিদ্যালয়ের আদর্শ শিক্ষক মান্ডি বাবুর ওই লেখাগুলো যেন বিদ্যালয়ের উদ্যোগে পুস্তক আকারে প্রকাশ করা হয়। এমনিতে তো আমার মতো অনেকের মনে অন্তরে হৃদয়ে মান্ডি বাবু বেঁচে থাকবেন কিন্তু যারা ডক্টর অমরনাথ ঝাঁ উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী নন ওরাও জানতে পারবে মান্ডি বাবুর চিন্তাভাবনা। আবার যেহেতু ইংরেজিতে লেখা তাহলেতো একদিন গোটা বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছাবে।

আজ এই শোকভরা মনে যতটা মনে পড়লো ততটাই লিখলাম।

আরেকটা কথা; মান্ডি বাবুর ধীরে ধীরে কুড়ি থেকে ত্রিশ কিলোমিটার প্রতি ঘন্টা গতিবেগে মোটর সাইকেল চালানোটা যখনই আমার মোটর সাইকেলের স্কেলেটরে মোচড় দিই তখনই মনে পড়ে।

পরিশেষে এটাই বলব, যদি সত্যিই আত্মা নামে কিছু থেকে থাকে তাহলে যেন মান্ডি বাবুর আত্মাও শান্তিতে থাকুক এটাই আমার কামনা।

কালিরাম মুরমু (প্রাক্তন বিজ্ঞান ছাত্র ২০০২-২০১০)