REV. P. O. BODDING সাহেব, সাঁওতাল ও সাঁওতালী

পুরো নাম paul olaf Bodding.(পৌল অলাফ বোডিং ) । যাকে সংক্ষিপ্তভাবে P.O. Bodding নামে ডাকা হয়। তবে সান্তাল আদিবাসীরা তাকে পিয়ো বোডিং ( pieạ boḍiń) নামে ডাকে। P.O. Bodding সাহেবের সময়কালে সান্তাল আদিবাসীরা আজকের মতো ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত ছিলনা। তাই ইউরোপিয়ান ভাষাগুলির শব্দকে নিজেদের মতো করেই ( santalized) উচ্চারণ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতো। যারফলে P.O. Bodding না বলে, তাঁর নামটি পিয়ো বোডিং নামেই সবাই চিনতো ও জানতো।

কিন্তু সান্তালি ভাষায় “পিয়ো ” ( pieạ) শব্দের বাংলা অর্থ হচ্ছে – “হলুদে পাখি ”। সান্তালরা সাধারণত হলুদে পাখিকে বার্তাবাহক পাখি হিসেবেই বিশ্বাস করে। বাড়ির পাশে হলুদে পাখি ডাক দিলেই, সান্তালরা বিশ্বাস করে -” আজ কোন অতিথি আসতে পারে “।






বাড়িতে আমার মাও প্রকৃতির ওপর দারুন বিশ্বাসী। হলুদে পাখির ডাক শুনলেই, অতিথি আগমনের জন্য প্রতীক্ষা করেন। সান্তাল আদিবাসীদের এই প্রকৃতি বিশ্বাসকে হয়তো অনেকেই বলবেন, এই আধুনিক ডিজিটাল যুগেও সান্তালরা সেই আদিমেই রয়ে গেল। যাহোক, আদিম – ডিজিটাল যুগ নিয়ে আমি বিতর্কে যাবোনা।

তবে পি.ও বোডিং কিন্তু সান্তাল জাতির জীবনে একজন শিক্ষার বাহক কিংবার শিক্ষার দূত হিসেবে এসেছিলেন। আর এজন্যই আমরা বলতে পারি, পি. ও. বোডিং এর নাম তৎকালীন ইংরেজি অজ্ঞ সান্তালরা পিয়ো বোডিং নাম দিয়ে সম্ভবত কোন ভূল করেনি।
.






এই পি.ও. বোডিং ছিলেন একজন ভাষাবিদ, লোকাচারবিদ, গবেষক, বিজ্ঞানী, এবং একজন নরওয়েজিয়ান মিশনারী। তিনি ২ নভেম্বর ১৮৬৫ সালে নরওয়ের গজোভিক শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম এডওয়ার্ড ওলসেন বোডিং এবং মা বিজি এমিলি ওয়েইনভোল্ট। বাবা ছিলেন গজোভিক শহরের একজন বই বিক্রেতা। সান্তালি ভাষা ও সাহিত্য গবেষনার অগ্রদূত lars olsen skrefsrud ছিলেন P.O. Bodding – এর বাবার বন্ধু। এই L.O. Skrefsrud কে সান্তালরা কেরাপ ( kerap) সাহেব নামেই জানে। ১৮৮১-৮২ সালে skrefsrud নরওয়েতে থাকাকালে P.O. Bodding তাঁর কাছে ভারতের সান্তালদের সম্পর্কে জানতে পারেন। তিনি ঐ সময় সান্তালদের কাছে আসার জন্য তাঁর ইচ্ছা ও আগ্রহের কথা প্রকাশ করেন। পি.ও. ১৮৮৩ সালে অসলো বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক এবং ১৮৮৯ সালে ক্রিশ্টিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক হন। ১৮৯০ সালের জানুয়ারি মাসে তিনি সান্তাল পারগানাতে যান এবং একই বছরের ডিসেম্বর মাসে মহুলপাহাড়িতে মিশনের দায়িত্ব গ্রহন করেন। ১৯০৯ সালে lars olsen skrefsrud মারা গেলে, সান্তাল মিশনের নেতা হিসেবে পি.ও. বোডিং ক্ষমতা গ্রহন করেন এবং সান্তাল মিশনের প্রশাসনিক কেন্দ্র টি ডুমকা জেলাতে স্থানান্তর করেন।

.
সান্তাল ভাষাকে নিয়ে গবেষণা করার প্রবল ইচ্ছা ও আগ্রহ ছিল তার। তিনি ৪৪ বছর ধরে নিরলস ভাবে সান্তালদের মধ্যে থেকে কাজ করে গেছেন। সান্তালি ভাষা – ভাষী লোকজনের জন্য তিনিই প্রথম সান্তালি বর্ণমালা ও ব্যাকরণের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি দাড় করিয়েছেন।
১৯২৩ সালে তিনি পাঁচটি ভলিউমের একটি সান্তালি অভিধান তৈরী করেন। সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একজন গবেষক হিসেবে P.O. Bodding সান্তাল জাতির জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে গেছেন। সান্তালদের মুখে মুখে প্রচলিত সাহিতের লিখিত রুপ দান করেছেন।






তার সৃষ্টিকর্ম গুলির মধ্যে হলো :

(1) studies in santal medicine and connected folklore.
(2) santal medicine.
(3) Folklore of the santal parganas.
(4) A chapter of santal folklore.
(5) A santal dictionary.
(6) The santals and disease.
(7) Santal riddles and witchcraft among the santals.
(8) Santal folk tales.
(9) Traditions and institutions of the santals( hoṛ koren mare hapṛam koak̕ katha .)
(10) Kukli puthi.
(11) Seren’ puthi.
(12) Hor kahniko.
(13) Baebel translation.
(14) Materials for a santali grammar.
(15) A santali grammar for Beginner’s.
এছাড়াও আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ রচনা সৃষ্টি করে গেছেন।

পি.ও. বোডিং ১৮৯৩ সালে বাংলার এশিয়াটিক সোসাইটির সদস্য এবং ১৮৯৪ সালে ক্রিশ্টিয়ানা ( বর্তমানে Norwegian academy of sciences) – এর সদস্য হন। ১৯০৭ সালে তিনি ব্রিটিশ ও ফরেন বাইবেল সোসাইটি লন্ডনের সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হন।

তিনি ১৯০১ সালে king Oscar স্বর্নপদক লাভ করেন। ১৯১০ সালে order of st. Olav – এর প্রথম শ্রেনীর নাইট উপাধি লাভ করেন। ১৯১২ সালে তিনি দিল্লী দূর্বার ( Delhi Durbar) পুরস্কার পান এবং ১৯৩১ সালে ফ্রেডজোফ নানসেন পুরস্কার লাভ করেন।






এই প্রখ্যাত বিজ্ঞানী ও গবেষক ভারতের ঝাড়খণ্ড, বিহার, আসাম, উড়িষ্যা, পশ্চিমবঙ্গ, রাজ্যগুলিতে এবং বাংলাদেশ ও নেপালের সান্তালদের নিকট অত্যন্ত জনপ্রিয় একজন ব্যক্তি।
স্ক্যান্ডিনেভীয় দেশগুলিতেও ( নরওয়ে, ডেনমার্ক, সুইডেন, ফিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড, দেশগুলিকে স্ক্যান্ডিনেভীয় দেশ বলা হয়) তিনি এখনও বেশ সুপরিচিত। ভারতের ঝাড়খণ্ড রাজ্যের central university র সহকারী অধ্যাপক শিল্পী হেমব্রম বলেন, ” পি.ও. বোডিং আমাদের কাছে একজন দেবতার মতো “.।

আরো জানা যায়, সান্তালি ভাষা ও ব্যাকরণকে কেন্দ্র করে মিশনারিদের সাথে পি. ও. বোডিংয়ের মতের মিল ছিলনা। যারফলে তাকে দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়। ভারত ত্যাগ করার পূর্বে বিদায় মুহূর্তে তিনি কান্নাভেজা কণ্ঠে তার সান্তাল প্রীতি এবং সান্তালদের ত্যাগ করে চলে যাওয়ার দূঃখ সান্তালদের কাছে প্রকাশ করেন।
পরবর্তীতে তিনি তার ডেনিশ স্ত্রী ক্রিশ্টিন লারসেন কে নিয়ে ডেনমার্কের ওডেন্সে জীবন যাপন করেন। এখানেই তিনি ২৫ সেপ্টেম্বর ১৯৩৮ সালে পরলোকগমন করেন। তাকে ওডেন্সের কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।

.
এই মহান পন্ডিত ব্যক্তি সান্তালদের জীবনে শিক্ষার আলোর দেবদূত হয়ে এসেছিলেন। তিনি সান্তাল জাতির হৃদয়ে, চিরদিন বেঁচে থাকবেন দেবতার আসনে।