জংগলমহলের হাওয়া

সকালে ঘুম থেকে উঠে পাড়ার একমাত্র চা দোকানে বসে চা খেতে খেতে গল্প করছিলাম, এমন সময় আমার মোবাইল ফোনটা বেজে উঠলো। ফোনটা হাতে নিয়ে দেখলাম একটা অচেনা নাম্বার থেকে ফোন আসছে। গলা ছেড়ে আমি ফোনটা রিসিভ করলাম। ফোনের অপরপ্রান্ত থেকে একটা চেনা গলার আওয়াজ পেলাম, বুঝতে কোনো অসুবিধা হলো না, দুরসম্পর্কের আমার এক দাদা কলকাতায় থাকে, তারি ফোন এটা। সামান্য কুশল বিনিময় হওয়ার পর সে আমাকে জিজ্ঞেস করল ভাই, “তোমাদের জঙ্গলমহলের ভোটের বাজার কেমন গরম?”






আমি বললাম “আমাদের জঙ্গলমহল এমনিতেই খুব গরম। তুমি তো শুনেছো আমাদের জঙ্গলমহলের এখনকার অবস্থা। সেটা নিয়ে আর কি বলব!”

দাদা বলল , “কি খবর ? নাতো আমি কোন খবর জানি না।”

“জানো তো, আজকাল শহরাঞ্চল ছড়িয়ে গ্রামেগঞ্জে একটা কথা প্রচলিত হয়ে উঠেছে। আমরা তো জানি, শব্দ দূষণ, বায়ু দূষণ, জল দূষণ এর কথা কিন্তু আজকাল আরেকটা দূষণ এসে হাজির সেটা হল সংবাদ দূষণ। আজকাল টিভিতে হোক বা খবরের কাগজ সব জায়গাতেই আজব আজব খবর ই দেখা যায়। সে সমস্ত গাঁজাখুরি খবর এর মাঝেই ভালো খবর হারিয়ে যায়। তুমি দেখে থাকবে প্রত্যেক সংবাদপত্রে র খবর, কোন নায়িকার সকালে কি হলো, তো কোন নায়িকার উমুক হয়েছে ইত্যাদি। “






“নায়িকার কথা বলতে একটা কথা মনে পড়ে গেল। আমাদের টলিউডে আগে নতুন নতুন অভিনেতা অভিনেত্রী তৈরি হতো। আজকাল দেখো টলিউডে নতুন নতুন রাজনীতির নেতা তৈরি হচ্ছে। যাকগে সে কথা, কি যেন বলছিলে?” আমার কথার মাঝেই দাদা কথাটা বলে উঠল।

আমিও বললাম “কথাটা মন্দ বলনি। বলছিলাম আমাদের জঙ্গলমহলের এখন আবহাওয়া খুব গরম। তোমাদের শহর কলকাতা তো নয় এটা।”

“সে কি বলো, এখন থেকেই ঝগড়া ঝাটি শুরু হয়ে গেল নাকি?”






“না, ঝগড়াঝাঁটি হবে কেন! সেই দিক থেকে আমাদের জঙ্গলমহল কিন্তু অনেকটাই শান্ত। আসলে যে কথাটা বলছিলাম, আমাদের দক্ষিণবঙ্গের অযোধ্যা পাহাড় থেকে শুশুনিয়া পাহাড় সাথে ঝিলিমিলি বারো মাইল জঙ্গল এখন আগুনের লেলিহান শিখায় দগ্ধ হয়ে যাচ্ছে। সেই আগুনের লেলিহান শিখা ছোট ছোট সবুজ গাছ থেকে শুরু করে পশু পাখিদের পুড়িয়ে জারখার করে দিচ্ছে। কত যে নিরীহ প্রাণীর জীবন হলো বলিদান তার কোন হিসাব নেই। পাড়ার একটা কুকুর মরলে, পশুপ্রেমী মানুষ জন এতক্ষণ হয়ত মোমবাতি জ্বালিয়ে প্রতিবাদে গর্জে উঠতেন। কিন্তু এখানে হাজার হাজার নিরীহ পশু পাখি, গাছগাছালি; যারা আমাদের বেঁচে থাকার জন্য নিরলস ভাবে অক্সিজেন সরবরাহ করে চলেছে তাদের জন্য সংবাদপত্র থেকে ইলেকট্রনিকস মিডিয়ায় সামান্য কোন খবরও নেই। জানি না সাংবাদিকদের ক্যামেরা গুলো কেন যে সব নায়ক নায়িকার পেছনেই লেগে থাকে! সেই আগুনের লেলিহান শিখায় পুড়ে খাক হয়ে যাচ্ছে আমাদের জঙ্গলমহলের মানুষের স্বপ্ন। আগুলের লেলিহান শিখার আঁচ সত্যিই গরম করে তুলেছে জঙ্গলমহলের আবহাওয়া। এ জঙ্গলকে আঁকড়ে ধরে আবর্তিত হয়েছে সাঁওতালদের জীবন জীবিকা। জঙ্গল পুড়লে শহুরে বাবুদের আর তাতে কি আসে যায়! আজকাল নাকি শুনেছি, অক্সিজেন কিনতে পাওয়া যায় তাই তো জঙ্গল পুড়লে কারো মাথা ব্যথা থাকার কথা নয়। জঙ্গল থেকে সাঁওতালদের অধিকার কেড়ে নেওয়ার জন্য সরকার নাকি আইন আনছে, এবার বলো সাঁওতালদের জীবিকার কথা জঙ্গল রক্ষা করা সরকারের কাছে একটা অযৌতিক কাজ মনে হতে পারে। তাই তো আমরা দেখেছি, মেলার জন্য অনুদান, খেলার জন্য অনুদান, পুজোর জন্য অনুদান, ক্লাবের জন্য অনুদান দেওয়ার সময় টাকার অভাব হয়না। আমাদের সবুজ সরসতা রক্ষা করার প্রয়োজনে কোন অনুদান আসে না। জানিনা তাতে মা ভবানীর ভান্ডারে টান পড়বে নাকি! এদিকে সবাই বলে চলেন, “জঙ্গল হলো আমাদের ফুসফুস।” আমাদের তো দেখে মনে হয় ফুসফুস নয় এটাকে তারা ভাবেন ফানুস।”






“সত্যিই এটা খুব খারাপ খবর। কোনদিন সংবাদ পত্রিকাগুলোতে এই খবর আমার চোখে পড়েনি। আমরা তো সুন্দর বন বাঁচানোর জন্য কত টাকাই না খরচ করি তার কিছুটা হলেও যদি জঙ্গল রক্ষা করার কাজে খরচ হতো তাহলে আজকে এই অবস্থা হতোনা। এই কটা দিন আগেই বনবিভাগ থেকে ‘ বন সহায়ক ‘ পদে নিয়োগ তো হলো, তাদের তাহলে কি কাজ দেওয়া হলো? আমিতো ভাবছিলাম জঙ্গল রক্ষা করতেই তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।”

“জানি না, কি কাজ দেওয়া হয়েছে। আমি তো কোনদিন দেখিনি জঙ্গল দেখতে কোনদিন কোন ফরেস্ট আফিসার এসেছে বলে। ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট এর কি কাজ সেটাই জানি না।”






যাক গে সে কথা, এখন তো আর ভেবে লাভ নেই। সামনের বছর দেখ, যাতে সকলকে সচেতন করা যায়। আর কি যেন একটা বলছিলে, আমাদের সাওতালদের জীবন জীবিকা জঙ্গলকে আঁকড়ে বেঁচে আছে। কেন কোন উন্নয়ন কি আজও হয়নি?

ক্রমশ…..