Monthly Archives: April 2021

শকুনের বাচ্চা মন ভরে খেল মানুষের মাংস

এক শকুনের বাচ্চা তার বাপের কাছে বায়না ধরলো, — “বাবা, আমি মানুষের মাংস খাব! “

শকুন বলল–“ঠিক আছে বেটা, সন্ধ্যার সময় এনে দেব। শকুন উড়ে গেল আর আসার সময় মুখে এক টুকরো শুকরের মাংস নিয়ে এসে বাসায় রাখলো ।






বাচ্চা বলল–“বাবা, এটা তো শুকরের মাংস, আমি মানুষের মাংস খেতে চাই।”

বাপ বলল –অপেক্ষা কর বাবা!

শকুনটা আবার উড়ে গেল আর আসার সময় এক মরা গরুর মাংস নিয়ে এলো।






বাচ্চা বলল –“আরে এটা তো গরুর মাংস নিয়ে এসেছ, মানুষের মাংস কোথায়?

এবার শকুনটা দুটো টুকরো একসাথে মুখে নিয়ে উড়াল দিল আর শুকরের মাংসটি একটা মসজিদের পাশে আর গরুর মাংস একটা মন্দিরের পাশে ফেলে দিয়ে চলে এলো!

কিছুক্ষণের মধ্যেই সেখানে শুরু হলো দাঙ্গা! কয়েকশ মানুষের লাশ পড়ে গেল! তখন গাছের ডাল থেকে নেমে বাপ-বেটা মিলে খুব তৃপ্তিতে মানুষের মাংস খেল।






বাচ্চাটা খেতে খেতে জিজ্ঞেস করছে– “বাবা, এত মানুষের মাংস এখানে কি করে এলো ?”

শকুন বললো — “এই মানুষ জাতটাই এরকম। সৃষ্টিকর্তা এদেরকে সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ বানিয়ে জন্ম দিয়েছেন, কিন্তু ধর্ম আর রাজনীতির নামে এদেরকে আমাদের থেকেও হিংস্র বানানো যেতে পারে! ”

বাচ্চা বললো তুমি ধর্মকে ব্যবহার করলে কেন, কতগুলো নীরিহ লোক মারা গেল , রাজনীতি করলেই পারতে!






বাবা হেসে উত্তর দিল, তাতেও নীরিহ লোকগুলোই মারা পড়তো! ধর্মটা আবেগের যায়গা তাই ফলাফলটাও তাৎক্ষণিক! তুমি আজই খেতে চেয়েছিলে! রাজনীতি টা কুটিল এবং জটিল, এটি শুরু হতে সময় নেয় কিন্তূ হলে আর থামেনা!

বাচ্চা বললো- “তোমার অনেক বুদ্ধি, বাবা”






শকুন — “আরেহ, ধুর! এটা তো আমি মানুষের কাছ থেকেই শিখছি, এদের একটা অংশ যখনই কোন অনিষ্ঠ করার চেষ্টায় ব্যর্থ হয় তখনই সহজ রাস্তা হিসেবে হয় ধর্মকে নয়তো রাজনীতিকে ব্যবহার করে!

সংগৃহীত

সাঁওতালি কাব্য সাহিত্যের কবিগুরু সাধু রামচাঁদ মুর্মু

“দেবন তিগুণ আদিবাসী বীর”সাঁওতালি ভাষার বিকাশের জন্য সাধু রাম চাঁদ মুর্মুর যে ভাবে আত্মনিয়োগ করেছেন বোধহয় আজ পর্যন্ত আর কেউ করতে পারেনি। সাধু রাম চাঁদ মুর্মু কে সাঁওতালি কাব্য সাহিত্যের কবিগুরু বা মহাকবি বলা হয়।

সাধু রাম চাঁদ মুর্মু পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বর্তমান ঝাড়গ্রাম জেলার শিলদা নিকটবর্তী কামারবাঁদি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন । বাংলা ১৩০৪ সালের বৈশাখ মাসের ১৬ তারিখে এই মহান কবির জন্ম। সাধু রাম চাঁদ মুর্মুর পিতার নাম মোহন মুর্মু, মা কুনি মুর্মু। সাধু রাম চাঁদ মুর্মুর চার ভাই বোনের ছিলেন, তাঁর মধ্যে সবার বড় ভাই দুবরাজ মুর্মু, মেজ ভাই ধনঞ্জয় মুর্মু, বোন মুগলি আর সবার ছোট হলেন কবি সাধু রাম চাঁদ মুর্মুর।

১৯০৬ সালে তাঁকে গ্রামের স্কুলে ভর্তি করা হয়। সাধু রাম চাঁদ মুর্মুর বাল্য অবস্থা থেকে মেধাবী ছিলেন। মেদিনীপুর জেলায় ভীমপুর মিশনারীগণ সাঁওতাল ছেলেমেয়েদের শিক্ষার উদ্দেশ্যে আবাসিক স্কুল স্থাপন করেন। স্কুলের পুরনো রেকর্ড থেকে সাধু রাম চাঁদ মুর্মুর নাম পাওয়া গেছে অর্থাৎ তিনি এই স্কুলে পড়তেন।স্কুলে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে নানা রকম হাতের কাজ শেখানো হতো, এবং পুরানো রেকর্ড অনুযায়ী সাধু রাম চাঁদ মুর্মু ভালোভাবেই ছুতার মিস্ত্রির কাজ, তাঁতের কাজ, এবং বিভিন্ন কারিগারি কাজে শিখেছিলেন এবং লেখাপড়া চিরদিনই পারদর্শী।

সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে সাধু রাম চাঁদ মুর্মুর জীবনেও পরিবর্তন আসে, ব্যক্তিগত জীবনে সাধু রাম চাঁদ মুর্মুর ছিলো দুই বিবাহিত স্ত্রী । প্রথম পক্ষের নাম মানকা আর দ্বিতীয় পক্ষের নাম কি পুটি। প্রথম পক্ষের স্ত্রীর তিন ছেলেমেয়ে কালিপদ , চুনারাম , কুনি। দ্বিতীয় পক্ষ স্ত্রী তিন সন্তান ধনঞ্জয় , ফুতু , মেয়ে কাকা। সাধু রাম চাঁদ মুর্মুর শুধু সান্তালি ভাষা সাহিত্য বিকাশের জন্য খাওয়া পরা চিন্তা না করে মন প্রাণ দিয়ে সাহিত্যচর্চার আত্মনিয়োগ করে গেছেন। সাধু রাম চাঁদ মুর্মুর লেখা “” দেবন তিঙ্গুন আদিবাসী বির “”।

আজ বাংলা-বিহার-উরিষ্যা আসামের ও বাংলাদেশ সাঁওতালদের মুখে মুখে শোনা যায়। সমাজ এবং জাতির প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা তাঁর ছিল বলেই এ ধরনের গান তিনি রচনা করতে পেরেছেন যা শুনলে আজও সান্তালদের মনে এক অন্য ধরনের অনুভুতি জায়গায়। গানটি সাঁওতালদের জাতীয় সংগীত হিসেবে আদৃত আছে। সাধু রাম চাঁদ মুর্মুর বুঝতে পেরেছিলেন , সাহিত্য ছাড়া কোন জাতির বিকাশ অসম্ভব ।

সান্তালি সাহিত্যের বিকাশ ও জাতির বিকাশের জন্য, বাড়ি-ঘর আত্মীয় পরিজন ছেড়ে আমরণ সাহিত্য-সাধনার নিজেকে ব্যাপৃত রেখেছিলেন এবং যা দিয়ে গেছেন তার প্রকৃত মূল্যায়ন এতদিন হয়নি। পাশাপাশি সাধু রাম চাঁদ মুর্মুর এও বুঝতে পেরেছিলেন মাতৃভাষার শিক্ষা ছাড়া কোন জাতি সার্বিক উন্নয়ন অসম্ভব । তাই তিনিই সর্বপ্রথম মাতৃভাষার শিক্ষার জন্য সাঁওতালি ভাষার স্বতন্ত্র লিপি “” মঁজ দাঁদের আঁক”” তৈরি করেছিলেন ১৯২৩ সালে।

“মঁজ দাঁদের আঁক” এই লিপি বা বর্ণ মালা সাঁওতালি ভাষার উপযোগী হয়েছিল। পরবর্তীতে কালে সেই বর্ণমালাতেই তাঁর সাহিত্য সম্ভার রচনা করেন। সাধু রামচাঁদ মুর্মু তৈরি করা বর্ণমালা সাঁওতাল সমাজে কাছে আজও অপরিচিত। সেই সময় অর্থভাবের জন্য এই লিপির ব্লক তৈরি করা ও প্রচার করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। সাঁওতাল সমাজে এটাই ছিল সবচেয়ে প্রথম এবং প্রাচীন লিপি। জীবিত কালে তিনি তার সাহিত্যকীর্তিকে আর্থিক অনটনের জন্য প্রকাশ করে যেতে পারেননি। দীর্ঘদিনের পান্ডুলিপি অরক্ষিত অবস্থায় ছিল।

তার মৃত্যুর পরে তার নামাঙ্কিত “” সাধু রামচাঁদ উইহৌর বাথান “” (সাধু রাম চাঁদ স্মৃতি রক্ষা কমিটি) এবং মারাংবুরু প্রেসের প্রচেষ্টায় এই পান্ডুলিপি গুলা গ্রন্থাকারে প্রকাশ পায়। ১) সারি ধরম সেরেং পুঁথি ১৯৬৯২) অল দহ অনড়হেঁ ১৯৭৮৩) লিটৌ গোডেৎ ১৯৭৯৪) সংসার ফেঁদ ১৯৮২৫) ঈশরড় ১৯৮৫ আজও প্রায় অনেকেরই অজানা যে সাধু রাম চাঁদ মুর্মুর “”সাধু”” শব্দ টা ব্যবহারের কারণ।

সানতালি সাহিত্যের ইতিহাস বই থেকে পাওয়া তথ্য অনুসারে – সাধু রাম চাঁদ মুর্মুর সঙ্গে যারা কাটিয়েছেন তারা অনেকে বলেন, বৃদ্ধা বয়সে সংসারের প্রতি কবির বিতৃষ্ণা সৃষ্টি হয় তাই কোলাহল থেকে দূরে প্রকৃতির নির্জনে কোলে কুঁড়ে ঘর বানিয়ে তাতে একাকি দিন যাপন করতেন। সাধুসন্ন্যাসীদের মতো জীবন শুরু করেন। জপ- তপা তাঁর জীবনের মূল উদ্দেশ্য। সাধুদের মত দাড়ি রাখেন, সাদা কাপড় পরিধান করতেন। সাধুর মতন জীবন যাপন করার জন্য তার নামের আগে সাধু শব্দ ব্যবহার হয়ে আসছে। কবি সাধু দার্শনিক , শিল্পী , প্রকৃতিপ্রেমী , সমাজসেবী , সমাজ সংস্কারক , গবেষক সাধু রামচাঁদ মূর্মু বাংলা ১৩৬১ বঙ্গাব্দে ২৯ শে অগ্রহায়ণ , ইংরেজির 1955 সালে দেহত্যাগ করেন।

বাংলা ১৩৭৭ সালের ১৫ই ভাদ্র তারিখের আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশি “সাঁওতালী বর্ণমালা ও সাহিত্য” শীর্ষক একটি প্রবন্ধে প্রাবন্ধিক লিখেছেন –“..পশ্চিমবাংলায় সাধু রামচাঁদ এবং উড়িষ্যার শ্রীযুক্ত রঘুনাথ মুরমু পৃথক পৃথক ভাবে সাঁওতালী বর্ণমালাতৈরী করেন। সাধু রামচাঁদের বর্ণমালা সাঁওতাল সমাজে অপরিচিত এবং অর্থাভাবে এই লিপির ব্লক তৈরী করে প্রচার করা সম্ভব হয়ে উঠে নি। এই বর্ণমালা রঘুনাথবাবুর তুলনায় প্রাচীনতর…।” ১৯২৩ সালে নির্মিত সাধু রামর্চাদের লিপির নাম “মজ দাঁদের”। এই লিপিতে তিনি “সারি ধরম” (শ্বাশ্বত ধর্ম গ্রন্থখানি রচনা করেন, যার খণ্ডিত পাণ্ডুলিপি আবিষ্কৃতহয়েছে।