Monthly Archives: April 2021

ব্রাজিলের বিপন্ন আদিবাসী

ফিরিয়ে দাও আমাদের আগের জঙ্গল জীবন। হারিয়ে যেতে বসেছে ‘ইন্ডিজেনাস’ পরিচয়টুকুও। ব্রাজিলের অধিকাংশ নাগরিকই অবগত নয় তাঁদের মূল পরিচয়, সংস্কৃতির সম্পর্কে। অরণ্য হারিয়ে ঠাঁই শহরে, টাউন বাবুদের বৈষম্যের জেরবার ব্রাজিলের প্রাচীন জনগোষ্ঠী।






ক্রমাগত জমি অধিগ্রহণ, ড্রাগ মাফিয়াদের বাড়বাড়ন্ত, বনভূমি ধ্বংস, অনৈতিক খনন— এসবের জেরেই ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসছে ব্রাজিলের প্রাচীন জনগোষ্ঠীগুলির আবাসস্থল। ফলত অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শহরে এসে মাথা গোঁজার ঠাঁই খুঁজছেন তাঁরা। তবে সেখানেও যে খুব একটা সুখকর হচ্ছে না তাঁদের টিকে থাকার লড়াই, তেমনটাই জানাচ্ছে রিও ডি জেনেইরোর ফেডারাল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা।






সাম্প্রতিক গণনা অনুযায়ী, ব্রাজিলের এক তৃতীয়াংশ প্রাচীন জনজাতির মানুষই বসবাস করেন শহরাঞ্চলে। যার সংখ্যা ৩ লক্ষ ১৫ হাজারের কাছাকাছি। তবে শহরের পটভূমি ও যাপনচিত্রে ক্রমশ মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে তাঁদের সংস্কৃতি। এমনকি হারিয়ে যেতে বসেছে ‘ইন্ডিজেনাস’ পরিচয়টুকুও। ব্রাজিলের অধিকাংশ নাগরিকই অবগত নয় তাঁদের মূল পরিচয়, সংস্কৃতির সম্পর্কে।






আদিবাসী সংস্কৃতি বলতে শুধুমাত্র অরণ্যযাপনকেই চিহ্নিত করেন খোদ ব্রাজিলের তথাকথিত ‘উন্নত’ শহরের বাসিন্দারা। আর তা হবে না-ই বা কেন? একজন আদিবাসী হয়েও সরকারি স্বীকৃতি পাওয়াই যে দুষ্কর ব্রাজিলের বুকে দাঁড়িয়ে।পাশাপাশি শহরাঞ্চলে বসবাসরত প্রাচীন জনজাতির মানুষেরা শিকার কুসংস্কারেরও। আদিবাসী পরিচয়ের জন্য অনেকক্ষেত্রেই বৈষম্যমূলক মন্তব্য, এমনকি হিংসারও সম্মুখীন হয়ে চলেছেন তাঁরা। সব মিলিয়ে ‘সভ্য’ সমাজ যেন দু’দিক থেকেই কোণঠাসা করে তুলছে তাঁদের অস্তিত্বকে।






কিন্তু একুশ শতকে দাঁড়িয়েও এই বৈষম্য কেন? প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে দেখা যাবে, ব্রাজিলের প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে আদিবাসী শিক্ষার জন্য বিশেষ বন্দোবস্ত নেওয়া হলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা গড়ে তোলার কোনোরকম উদ্যোগ নেয়নি ব্রাজিল প্রশাসন। পাশাপাশি খাতায় কলমে অস্তিত্ব থাকলেও নিষ্ক্রিয় আদিবাসী উন্নয়ন দপ্তর। বিভাজন হোক কি বৈষম্য— তার সূত্রপাতের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে রয়েছে বলসোনারো-র দুর্নিতিগ্রস্ত প্রশাসন। তবে এই বৈষম্যের বীজ বপন করা হয়েছিল বহু বহু যুগ আগে।






উনিশ শতকের শুরুর দিকের কথা। তখনও ঔপনিবেশিক শাসন কায়েম রয়েছে ব্রাজিলে। জনগণনা শুরু হয়েছিল সেই সময়। তবে তা কেবল সীমাবদ্ধ ছিল শহর, মফঃস্বল অঞ্চলেই। কেননা, ঔপনিবেশিক শাসকদের কাছে সেনসাসের মূল উদ্দেশ্যই ছিল কর-আদায়। অরণ্যে বসবাসরত জনগোষ্ঠীগুলি যে আদতে কোনো আর্থিক কর প্রয়োগ করতে পারবে না, সে কথা মাথায় রেখেই ব্রাত্য করে রাখা হয়েছিল তাঁদের। আজ এত বছর পরেও এতটুকু পরিবর্তন আসেনি সেই রীতিতে। একদিকে যেমন অব্যাহত রয়েছে অরণ্যনিধন প্রক্রিয়া, তেমনই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি শহরেও। এমন অবস্থায় দাঁড়িয়ে শিক্ষাকেই হাতিয়ার করে নিয়েছেন প্রাচীন জনজাতির মানুষেরা।






২০১৯ সালের হিসাব বলছে ব্রাজিলে বসবাসরত মোট ৯ লক্ষ আদিবাসী মানুষের মধ্যে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্যরত ৮১ হাজার শিক্ষার্থী। অর্থাৎ, শিক্ষার হার প্রায় ৯ শতাংশের কাছাকাছি। পাশাপাশি, অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে শিল্পক্ষেত্রেও নিজেদের সংস্কৃতির সংমিশ্রণ ঘটিয়ে চলেছেন তাঁরা। তাতে আসছে সাফল্যও। গ্রহণযোগ্যতার পাশাপাশি স্বীকৃতি মিলছে আন্তর্জাতিক স্তরে। যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হল আমাজনের প্রাচীন ‘কাদিইউ’ চিত্রকলা।

তবে এভাবেই একদিনে সম্ভব নয় সামাজিক বদল। জনসচেতনতা গড়ে তুলতে এগিয়ে আসতে হবে প্রশাসনকেই। বদল আনতে হবে শিক্ষাব্যবস্থাতেও। সেই দাবিতেই সরব ব্রাজিলের আদিবাসী পড়ুয়ারা। চলছে এক অসম লড়াই। স্বপ্ন, এমন এক বৈষম্যমূলক সমাজের যেখানে একদিন সমস্ত মানুষই তাঁদের স্বীকৃতি দেবে ‘পূর্বপুরুষ’ হিসাবে…