🌲🌲💐💐🦈🐠🐟পৃথিবীর বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য পরিবর্তন ও সাঁওতাল জাতির সেঁদরা 🐟🐠🦈🌲🌲🌺🌺🌺

🖋️🖊️✍️– কুনৗমি মুরমু

এই চৈত্র-বৈশাখ মাসে সাঁওতাল জাতিগোষ্ঠীর প্রাচীনকাল থেকে “সেঁদরা” বা “অনুসন্ধান/খোঁজ” নামক এক পারম্পরিক প্রথা বিদ্যমান। বর্তমানে এই সেঁদরা শব্দকে অন্যান্য ভাষায় অনুবাদ করে বলা হচ্ছে শিকার। যা কিন্তু অনেকাংশে সত্যি। কেননা জানা গেছে একসময় অযোধ্যায় শিকারের সময় ঝাড়খণ্ড থেকে আসা শিকারীরা তীর বল্লম এর সাথে বন্দুক নিয়েও শিকার করেছে।

পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খন্ড ও ওডিশার প্রত্যেক জায়গার শিকারীরা সেঁদরা পর্ব শেষ করার পর মনোরঞ্জনের জন্য কাহিনী বেষ্টিত “সিংরৗই” এবং প্রাচীন সংস্কৃতি “দোঁগেড়” এর নাচ-গান করে।
পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া জেলার অযোধ্যার সুতৗন টৗঁডি হলো সাঁওতাল সমাজের শীর্ষ আদালত (ল মহল/Law Mahal)। এই শীর্ষ আদালতে সাঁওতাল সমাজের অমীমাংসিত বিচার সম্পন্ন হওয়ার কথা।

কিন্তু বর্তমানে কোন বিচার সভা না হওয়া সত্ত্বেও দূর-দূরান্ত থেকে গাড়ি ভাড়া করে তীর-ধনুক নিয়ে মানুষজন শিকারি হিসেবে পৌঁছে যাচ্ছে। সেই গাড়িতে করে আসা যাওয়া এবং কোন কোন বছরের সোশ্যাল মিডিয়াতে ভাইরাল হওয়া বন-শুয়োর ও ময়ূরের ছবি সেঁদরার অর্থকে শিকারের সঙ্গে সমার্থক করে দিয়েছে। সেই কারণে বর্তমানে সরকারের তরফ থেকে শিকারকে বন্ধ করার জন্য কড়া পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। কিন্তু সাঁওতাল জাতিগোষ্ঠীর সেঁদরার কারণেই কি বন্যজন্তু ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বা পৃথিবীর বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য পরিবর্তিত হচ্ছে??এই প্রশ্নের উত্তরের খোঁজেই আমার এই ক্ষুদ্র লেখনি।






যেসব কারণে পৃথিবীর বাস্তুতন্ত্র প্রভাবিত হচ্ছে সেগুলি হলো-

(১) অরণ্যচ্ছেদন:– পৃথিবীর বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্যকে প্রভাবিত করেছে এমন অনেক কারণ রয়েছে। যেমন নগরায়নের জন্য, কলকারখানা স্থাপনের জন্য, খনিজ সম্পদ খনন করার জন্য, জাতীয় সড়ক চওড়া করার জন্য হাজার হাজার বড় বড় গাছ শিকড় সমেত উপড়ে ফেলা হচ্ছে, তার পরিবর্তে কোথাও চারা গাছ রোপন করা হচ্ছে না। কোন কোন খনিজ পাহাড় বা শাল মহুলের, বনজ ঔষধি গাছের জঙ্গলকে রক্ষা করার জন্য স্থানীয় অধিবাসীরা আন্দোলন করেছে তখন আইনের লাঠি ওদের পিঠে পড়েছে।গত ৪০ বছরে পুরো বিশ্বে আনুমানিক ১ বিলিয়ন হেক্টর এলাকার গাছপালা ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে তার মধ্যে ২০১৬ সালে সবচেয়ে বেশি ২৯.৭ মিলিয়ন হেক্টর বন জঙ্গল ধ্বংস করা হয়েছে।

২০১৮ সাল পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি যেসব দেশের বন জঙ্গল ধ্বংস করা হয়েছে সেগুলি হল ব্রাজিলের ১.৩৫ মিলিয়ন হেক্টর, কোংগো (গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র) এর ৪.৮১ লক্ষ হেক্টর, ইন্দোনেশিয়ার ৩.৪০ লক্ষ হেক্টর, কলম্বিয়ার ১.৭৭ লক্ষ হেক্টর বলিভিয়ার ১.৫৫ লক্ষ হেক্টর। বিশ্বে এই পরিমাণ বনজ সম্পদ ধ্বংসের কারনে জলবায়ুর পরিবর্তন হচ্ছে এবং বিশ্ব উষ্ণায়নের হার ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০১৭ সাল পর্যন্ত সাধারণের তুলনায় ৫০% অধিক কার্বন ডাই অক্সাইড এবং ২০% গ্রীন হাউস গ্যাস উৎপন্ন হয়েছে।।






(২) জনসংখ্যা বৃদ্ধি:– পৃথিবীর অনেক অনেক সম্প্রদায়ের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার অনেক বেশি যে কারণে বছরে ১.১% বা বছরে ৮০ মিলিয়ন জনসংখ্যা বৃদ্ধি ১৩ মিলিয়ন হেক্টর বনভূমি ধ্বংসের সমান। কারণ এদের জন্য এই বর্ধিত জনসংখ্যার জন্য পৃথিবীকে অক্সিজেন সরবরাহ করতে গিয়ে বায়ুমণ্ডলের ভারসাম্য পরিবর্তিত হয়ে পৃথিবীর জঙ্গল এলাকার তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং ঘনীভবনের চক্র ব্যাহত হয়ে বৃষ্টিপাতের চক্র পরিবর্তিত হচ্ছে।






(৩) প্লাস্টিকের উৎপাদন:– প্লাস্টিকের উৎপাদন হলো পৃথিবীর মারাত্মক সমস্যা। প্লাস্টিক ব্যবহার করে ফেলে দেওয়া বর্জ্য প্লাস্টিক শহরের ড্রেন থেকে নদীতে এবং নদী থেকে সাগরে বা মহাসাগরে পৌঁছচ্ছে। বর্তমানে পৃথিবীতে বছরে প্রায় ৩০০ মিলিয়ন টন প্লাস্টিক উৎপাদন করে ব্যবহার করা হচ্ছে এবং ফেলে দেওয়ার পরে ১০ থেকে ২০ মিলিয়ন টন নদীর জলের সাথে বাহিত হয়ে মহাসাগরে পৌঁছে জলজ প্রাণীর জীবনকে ব্যাহত করছে। বিশ্বের সমস্ত মহাসাগরের ভাসমান প্লাস্টিকের আনুমানিক ওজন হল ২,৬৮,৯৪০ টন। এই প্লাস্টিক গুলি যেহেতু বছরের-পর-বছর জলের মধ্যে ভাসমান হয়ে থাকছে তাই প্লাস্টিক গুলিতে উপস্থিত রাসায়নিক উপাদান গুলি জলে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে জলজ প্রাণীর শরীরে প্রবেশ করছে এছাড়া অনেক প্রাণী অজান্তে প্লাস্টিক খেয়ে ফেলে মৃত্যুবরণ করছে যেমন স্কটল্যান্ড এর উপকূলে ২০১৭ সালে একটি তিমি ৯ পাউন্ড প্লাস্টিক খেয়ে ফেলার কারণে মারা যায়।






(৪) জল দূষণ:– কোন বড় নদীর ধারেই সাধারণত কল কারখানা স্থাপন করা হয়েছে এবং কলকারখানা থেকে নির্গত বর্জিত নাইট্রেট, ফসফরাস, কপার, জিংক, ক্যাডমিয়াম, হাইড্রোকার্বন প্রভৃতি রাসায়নিক পদার্থ দ্বারা সমুদ্রের জল দূষিত হচ্ছে। বিশ্বে খাদ্য পণ্যের চাহিদা বাড়ায় ফলন বাড়ানোর জন্য অধিক মাত্রায় নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশিয়াম ব্যবহার করার কারণে মাছ, ব্যাঙ ইত্যাদির যেমন বেঁচে থাকার অসুবিধা হচ্ছে সেরকমই ভূগর্ভস্থ জল ধীরে ধীরে দূষিত হচ্ছে।






(৫) চোরাশিকার:– বন্য জীবজন্তু হ্রাস হওয়ার অন্যতম কারণ হলো আধিকারিকের মদতে চোরাশিকার। গবেষণায় দেখা গেছে ৮৩% বন্য জীবজন্তু শিকারের কারণে মারা গেছে।

২০১৯ এর গণনা অনুসারে ভারতে ২৯৬৭ টি বাঘ, ৩০০০ টি একশৃঙ্গ গন্ডার, ২০০০টি হাতি এবং ২০১৮ এর গণনা অনুসারে ১২৮৫২টি চিতাবাঘ এবং ১৩৪৯ টি প্রজাতির পাখি রয়েছে। তুলনামূলক হিসেবে এই পশুপাখি গুলির জনসংখ্যা আরো বৃদ্ধি পেত যদি ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, গ্রিনল্যান্ড-এর পেশাদারী শিকারির মতো ভারতেও বন্দুক দিয়ে না শিকার করা হতো। এই পেশাদারী শিকারিরা সারা বছরেই শিকার করে বাঘের চামড়া, হাতির দাঁত ইত্যাদি বিদেশের বাজারে লক্ষ লক্ষ টাকার বিনিময়ে বিক্রি করছে।






ভারতের আদিবাসী গোষ্ঠীর সাঁওতাল জাতির মানুষরা বছরের শুধুমাত্র একটি মরসুমে সেঁদরা পালন করে এবং ওই সময় হয়তো কিছু পাখি এবং খরগোশ শিকার করে মেরে ফেলে। সেই হিসেবে দেখলে গোটা বিশ্বের সাঁওতাল মিলে ৮৩ শতাংশের ০.৫% শিকার করে তাই এটা কখনও বলা যাবে না যে সাঁওতালরা বন্যজন্তু হত্যার জন্য চোরা শিকারির মতো অনেকাংশে দায়ী। কারণ সাঁওতালরা বছরে একবার এই শিকার করে বনৌষধি খোঁজার সময় বা সেঁদরা করার সময় এবং বন-জঙ্গল ধ্বংসের পেছনে সাঁওতালদের কোনো অবদান নেই। কারণ সাঁওতালরা প্রাচীনকাল থেকে প্রকৃতিকে রক্ষা করে আসছে ভগবানের রূপে প্রকৃতিকে পুজো করে। এরা শুধু বাড়ি বানানোর সরঞ্জাম আসবাবপত্র এবং জ্বালানির জন্য একমাত্র পুরনো গাছ কেটে ফেলে কিন্তু সেই হিসেব খুবই নগণ্য। কিছু এলাকার মানুষজন একসময় কচিকাঁচা শাল গাছ কেটে শুকনো করে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করতো কিন্তু এখন বন্ধ করে দিয়েছে এবং কিছু কাঠ ব্যবসায়ীরা একসময় জঙ্গল আধিকারিক এর সহায়তায় জঙ্গলের পুরনো গাছ বিক্রি করতো কিন্তু সেটাও এখন অনেকটা ক্রমহ্রাসমান। তাই এখন এই সিদ্ধান্তে উপনিত হতে পারি যে পৃথিবীর বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য ব্যাহত হওয়ার পেছনে সাঁওতাল দের কোন ভূমিকা নেই।

সাঁওতালদের সেঁদরা নামক পরম্পরা কে বন্য প্রাণী এবং উদ্ভিদ সংরক্ষণের বাহানা করে শেষ করতে চাইলে পোষা প্রাণী হত্যা যেমন পাঁঠা বলি, উঁট পূজা, Beef Marketing সবকিছুই চিরকালের জন্য বন্ধ করতে হবে। কোথাও কোন ধর্মের দেবস্থানে কোন প্রাণীর এক ফোঁটা রক্তও যেন না পড়ে সেইরকম নিয়মকানুন লাগু হওয়া প্রয়োজন।