ঝোলাছাপ পরিবেশ প্রেমীরা জানুন সেঁদ্‌রা শব্দের অর্থ

ঐতিহ্য ও পরম্পরার উপর এক অদৃশ্য আক্রমন

এম. নেপোলিয়ান টুডু :- কিছু কিছু সানতাড়ী শব্দ আছে,যেগুলির প্রতিশব্দ হয় না বললেই চলে। আর যখনই এক ভাষা থেকে অন্য ভাষায় এগুলির রুপান্তর করা হয়, তখন তার অর্থ সম্পূর্নরুপে বদলে যায়। এক বোঝাতে গিয়ে ভিন্ন রুপেই প্রকট হয়ে ওঠে। সাঁওতালী ভাষায় সেরকমই একটি শব্দ হচ্ছে “সেঁদ্‌রা ” । “টামাক” মানে যেমন ধামসা হতে পারে না তেমনি ” সেঁদ্‌রা ” মানে কখনও শিকার হতে পারে না। তবে বাংলা সংবাদপত্র তথা বাঙালী সংস্কৃতি ঢেড়শ কে Lady’s finger বলার মতোই, মানানসইভাবে শিকার বলতেই অভ্যস্ত। যা আদৌ সমকক্ষ নয়, হতে পারে না।

গত দু’তিনদিন ধরেই বাংলা সংবাদপত্রগুলি ” আজদিয়া’ বুরু সেঁদ্‌রা ” নিয়ে সংবাদ প্রেরনে ব্যস্ত। এগুলির একমুখী ও বিশ্লেষনহীন শব্দতোরন যেকোনো সুস্থ মানসিকতার মননে নেতিবাচক প্রভাব তৈরী করতে বাধ্য হবে। সমালোচনা হোক সেটারও প্রয়োজন আছে , সাথে ” সেঁদ্‌রা”র ইতিবাচক দিকগুলোও ছাপার অক্ষরে স্থান লাভ করুক। তা না করে শুধু ” সেঁদ্‌রা”র শিরদাঁড়া দেখানোই যেন মূল উদ্দেশ্য হয়ে দাড়িয়েছে। বনবিভাগের কর্মীদেরও এই নিয়ে দৌড়ঝাপের শেষ নেই। আরো বড় প্রাপ্য,কিছু বুদ্ধীজিবী বন্ধুদের সোস্যাল মিডিয়াতে অসহ্য, অশ্লীল, অপমানজনক কথাবার্তা। এর প্রত্যেকটিই ভিত্তিহীন, যুক্তিতর্কের বাইরের কূপমন্ডুকতা মাত্র!

সাঁওতাল জাতিগোষ্ঠীর এই “আজদিয়া’ সেঁদ্‌রা ” আজকের নয়। এটা আমাদের ঐতিহ্য, এটা আমাদের পরম্পরা। এর শুরু ঠিক তখন থেকেই, যখন বনবিভাগ তৈরী হয়নি। বন ছিল, মানুষ ছিল, পশুপাখি ছিল আর ছিল অবর্ননীয় এক জৈবিক সহাবস্থান। বনজ সম্পদ রক্ষা, জাতিগত পরিচয়, কর্মগত তাগিদ, অস্তিত্বগত প্রয়োজনেই আ:সার তুলে নেওয়া। পশুহত্যা নয় আত্মরক্ষার তাগিতেই এর সূত্রপাত। জাতি, ধর্ম, দেবদেবী নিয়েই এই ঐতিহ্যের পথচলা।

এটা কোনো ছেলেখেলা নয়, যা ইচ্ছা তাই করা হলো। শুরু থেকে শেষপর্যন্ত সেঁদ্‌রা একটা নির্দিস্ট নিয়ম মেনে পরিচালিত হয়। সাথে থাকে ঐতিহ্যবাহী পূজার্চনা, নাচগান ও বিচারআচার। যেসব অবাঙালী সাঁওতালী সাহিত্য ও সংস্কৃতির সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে জড়িয়ে আছে, তারা পরিস্কারভাবেই জানেন সেঁদ্‌রার মাহাত্ম্য। এই পৃথিবীকে সুজলা, সুফলা, বাসযোগ্য করে রাখতে সাঁওতাল সংস্কৃতির এই তাৎপর্য্যপূর্ন পরম্পরাকে অস্বীকার করার কোনো জায়গা নেই।

হয়তো পারিপার্শ্বিক প্রভাবে কিছু বিক্ষিপ্ত ঘটনা পরিলক্ষিত হতে পারে কিন্তু অপসংস্কৃতির তকমা পেতে পারে না। বর্তমানে সবুজ রক্ষার্থে ব্যর্থ আধিকারিক ও বনকর্মীদের তির্যক বাক্যবানে “সেঁদ্‌রা ” কে প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে। কিন্তু এইসব দুর্বল ব্যাখা দিয়ে সোনালী অতীত কে কখনোই দমানো যাবে না।

তবে চিন্তা একটাই। এইসব মিথ্যা জিগির তুলে সাঁওতাল ঐতিহ্যকে ভেঙেচুরে দেওয়া হচ্ছে না তো? কারন অনেক ক্ষেত্রেই সুন্দর সংস্কৃতির বিভিন্ন অংশ কে প্রকট ভাবেই বিকৃত করে দেখানো হয়েছে। কিন্তু এই চালাকি পরে খুব ভালোভাবেই ধরা পড়েছে। রাম- লক্ষন কে আ:সারের সাথে পৈতাধারী করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ভাববার বিষয় এটাই, আজ পর্যন্ত কি পৈতাধারী কোনো ছেলে বা মেয়ে আ:সার চালনায় দক্ষতা দেখাতে পেরেছে ? তবে রাম_লক্ষন কে নিয়ে গর্বের শেষ নেই! রামায়ন, মহাভারত, কবিতা, গল্প, আরো কত কি!

যারা “সেঁদ্‌রা ” উপলক্ষ্য করে অসত্য,অযৌক্তিক কথা বলছেন, তারা একটু ভাবুন। ভাবতে শিখুন। বুক চাপড়ে বলুন তো ” সেঁদ্‌রা”র জন্যই কি হাজার হাজার গাছ কাটা হচ্ছে। সেঁদ্‌রার ফলেই কি বুনোহাতি বন থেকে বেরিয়ে এসে জঙ্গল লাগোয়া মানুষ কে মেরে ফেলছে, ফসল নস্ট করছে, ঘরবাড়ি ভাঙছে। বছরের একটা দিনের জন্যই এতকিছু না এর আড়ালে লুকিয়ে আছে অন্য কিছু অভিসন্ধী ?

তাই সংবাদ দাতারাও দুকথা লিখার আগে একবার ভাববেন প্লিজ্‌ । কারন কোনো জাতির ভাবাবেগ কে আঘাত করার অধিকার আপনাদের নেই। এই অহিংস পরম্পরা নিছক মাংস খাওয়ার লোভে নয়। আসলে আপনারা যাকে ভুলকরে শিকার বলেন, সেই ” সেঁদ্‌রা” আসলে আদিম সাম্যবাদের এক গুরুত্বপূর্ন অনুশীলন। তাই চোখ বন্ধ করে বলা যায় – The history of the Bow and Arrow is the History of Mankind (The SANTAL ).