সেন্দ্রা প্রথাকে ‘শিকার উৎসব’ বলে দাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা আসলে একটি রাষ্ট্রীয় চক্রান্ত – শুভ নাথ

খুব সোজা বাংলায় আদিবাসী শব্দের অর্থ ‘আদি বাসিন্দা’। এই ভারতীয় উপমহাদেশের আদিবাসীরাই হলেন এখানের আদিমতম বাসিন্দা। যাঁদের ধর্ম হল সারি বা সারনা ধর্ম। এই আদিবাসীদের জীবন-যাপনে ও সংস্কৃতির সাথে বন-জঙ্গলের সম্পর্ক তাঁদের সৃষ্টির প্রথম থেকেই জড়িয়ে রয়েছে। একটু গভীরে দেখলে দেখতে পাওয়া যায় তাঁদের প্রত্যেক উৎসবের সাথে রয়েছে প্রকৃতির এক নিবিড় সম্পর্ক। বাস্তবে তাঁরা জীবন নির্ধারণ করেন বনের উপর ভরসা করে। তাই তাঁদের কাছে বন ও বন সংক্রান্ত সকল বিষয়কে বাঁচিয়ে রাখাই প্রধান কর্তব্য। আর সেই কর্তব্য তাঁরা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে এসেছে এতকাল ধরে। বনজ প্রাণী রক্ষার অজুহাতে কেন আজ হঠাৎ করে তাঁদের ‘সেন্দ্রা’ প্রথা পালন করতে বাধা দেওয়া হচ্ছে? কেনই বা এই তথাকথিত সভ্য সমাজ ‘সেন্দ্রা’ প্রথাকে ‘শিকার উৎসব’ বলে দাগিয়ে দিয়ে এক জনরোষের সৃষ্টি করতে চাইছে আদিবাসীদের বিরুদ্ধে? কেন ‘সেন্দ্রা’ অভিযানের সময় রাষ্ট্রীয় মদতপুষ্ট প্রকৃতিবাদী এনজিওগুলি ঝাঁপিয়ে পড়ছে আদিবাসী সংস্কৃতির বিরুদ্ধে? এই সকল প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে প্রথমেই জানতে হবে ‘সেন্দ্রা’ প্রথা আসলে কি।
সেন্দ্রা প্রথা ঃ-

সেন্দ্রা একটি সাঁওতালি শব্দ যার বাংলা অর্থ হল অনুসন্ধান বা খোঁজ। মানুষের আদিম প্রবৃত্তি হল জীবন-যাপনের স্বার্থে খোঁজ করে যাওয়া। এই খোঁজের মধ্যে দিয়েই বিকাশ ঘটেছে মানব সভ্যতার। এমনই প্রকৃতির উপর নির্ভর করে যাঁরা বেঁচে থাকেন তাঁদেরও খোঁজ চালিয়ে যেতে হয় প্রকৃতির কোথায় কি রয়েছে। প্রকৃতির মধ্যে কখন কোন বিষয়ের আগমন হয়ে আবার কোন সময় তার শেষ হয়। আদিবাসী জীবনের প্রত্যেকটি দ্রব্য আসতো প্রকৃতি থেকে। তাই বর্ষায় জঙ্গল ঘন হয়ে ওঠার আগেই তাঁদের জঙ্গলে গিয়ে খোঁজ করে আসতে হত কোথায় কি রয়েছে। কারণ বর্ষায় জঙ্গল ঘন হলে সেই খোঁজ করা এক প্রকার অসম্ভব হয়ে পড়ত। তাই বর্ষার পূর্বেই তাঁরা জঙ্গলে গিয়ে খোঁজ নিয়ে আসতো কোথায় কোন গাছ-পালা-লতা-গুল্ম-পশু-পাখি রয়েছে। পূর্বের বছরে যে সকল দ্রব্যাদি বা পশু-পাখি জঙ্গলে পাওয়া গেছে সেসব আছে কি নেই। থাকলে তার সংখ্যার হ্রাস-বৃদ্ধি কতটা হয়েছে। আসলে এ হল একপ্রকার সার্ভে। এইবার এই সার্ভের রিপোর্ট তাঁরা এসে জমা দিত সমাজপতিদের বা মাঝিদের কাছে। এই সমাজপতিরা নির্ধারণ করতো আগামী একবছর তাঁরা কীভাবে এবং কোন কোন বিষয় জঙ্গল থেকে নিয়ে ব্যবহার করবে এবং সংশ্লিষ্ট জঙ্গলের প্রতি আগামী একবছরে তাঁদের কর্তব্য ও কর্মসূচী কি কি হবে। এইভাবে কোনো পশু-পাখির প্রজাতির হ্রাস ও কোনো প্রজাতির সংখ্যাধিক্য ঘটলে তাঁরা চিন্তিত হয়ে পড়ত। কারণ পশুদের জঙ্গলে খাদ্যাভাব ঘটলে তাঁরা সংশ্লিষ্ট গ্রামে ঢুকে গ্রামবাসীদের কষ্টার্জিত ফসল, গবাদি পশু-পাখি ইত্যাদিকে নষ্ট করতে পারে। এই খোঁজ চালানোর সময় বন্যপ্রাণীদের থেকে আত্মরক্ষার্থে থাকতো অস্ত্র। অনেক সময় আত্মরক্ষা করতে গিয়ে আদিবাসীদের হাতে মারা পড়ত বন্যপ্রাণী আবার অনেক সময় তাঁরা সংখ্যাধিক্য প্রাণী শিকার করতো। সেই শিকারের সংখ্যা খুবই নগণ্য। এই শিকারের উপরে সমান ভাগে ভাগ থাকতো সমগ্র গ্রামবাসীর। প্রকৃতির মধ্যে সকল বিষয়ের ভারসাম্য রক্ষার্থে এক গুরুপ্তপূর্ণ কর্মপ্রণালি হল এই ‘সেন্দ্রা’। তবে প্রকৃতির কোলে থাকা মানুষদের সাথে বন্যপ্রাণীর সংঘাত এক আদিম লড়াই। ‘প্রকৃতির সাথে মানুষের সংঘাত নয়, প্রকৃতির সাথে মানুষের সহাবস্থান’ এই বিষয়ে হাজার হাজার বছর ধরে গুরুপ্তপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে এই ‘সেন্দ্রা প্রথা’ । যা আগামীতেও করবে বলে আমার ধারণা।

যখন এই মহামারি মানুষকে নতুন করে পরিবেশ সম্পর্কে ভাবিয়ে তুলছে তখন আমাদেরও ভাবতে হবে আমরা মেকি রাষ্ট্রীয় পরিবেশ প্রেমের দিকে ঝুঁকবো না কি সত্যি পরিবেশকে যাঁরা এতদিন রক্ষা করে এসেছে ও আসছে তাঁদের পক্ষে দাঁড়িয়ে পরিবেশ বাঁচানোর লড়াইকে আরও মজবুত করবো।

তাহলে আজ ‘সেন্দ্রা প্রথা’ বন্ধ করে দেওয়ার এত তোড়জোড় কেন?

চিরকাল সামন্ততান্ত্রিক ও ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষের বিস্তার লাভের জন্য প্রয়োজন হয়ে আসছে অত্যাধিক কাঁচামাল। শৌখিনতা ও বিলাসিতার স্বার্থে এক সময় রাজা-মহারাজা-জমিদাররা মেতেছে বৃক্ষ নিধন যজ্ঞে। বীরত্বের ছাপ রেখে যেতে নির্বিচারে খুন করেছে লক্ষ্য লক্ষ্য বন্য প্রাণীদের। যা ছিল এক শ্রেণীর মানুষের সাথে প্রকৃতির মুখোমুখি সংঘাতের সূচনা। সেই সংঘাতের মাঝে দাঁড়িয়ে আদিবাসী জাতি প্রকৃতির পক্ষ নিয়ে বারবার সামন্ততন্ত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছে। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত আসার পরে থেকে এই সংঘাত বাড়তে থাকে। ভারতবর্ষে ঔপনিবেশিকতার সূচনার সাথে সাথেই বদলে গেলো দৃশ্য। ঔপনিবেশিকতার বিস্তার লাভের জন্য প্রয়োজন হয়ে পড়ল অত্যাধিক কাঁচামাল। যার মূল ভাণ্ডার ছিল ভারতবর্ষের হেক্টরের পর হেক্টর গভীর বন-জঙ্গল। সেই বনজ সম্পদে হাত পড়ার সাথে সাথে ফুঁসে উঠলো আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী। এক কঠিন বাধার সম্মুখীন হল ঔপনিবেশিক শক্তিগুলি। তার পরবর্তি সময়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ লক্ষ্য করলো তাঁদের প্রয়োজনীয় কাঁচা মালের যে ভাণ্ডার অর্থাৎ গভীর অরণ্য সেই অরণ্যের সাথে নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে এই দেশের আদি বাসিন্দাদের। ভারতীয় সামন্ততান্ত্রিক শক্তিরগুলির সাথে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শক্তি সমঝোতা করে স্থির করে ফেললো অরণ্যের সাথে আদিবাসীদের সম্পর্ক বিচ্ছেদ করার নক্সা। পাহাড় জঙ্গলে থাকা সহজ-সরল কর্মঠ সাহসী কিছু সংখ্যক আদিবাসী জাতিকে দামিন-ই-কো অর্থাৎ সমতলভূমির লোভ দেখিয়ে আনা হল জঙ্গল পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে। ধীরে ধীরে অরণ্যের উপর অধিকার বিস্তার করতে শুরু করে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ। সেই কাঁচামালের সাথে শ্রমের মিলন না হলে সাম্রাজ্যবাদ টিকে থাকে না। তাই শুরু হল আদিবাসী শ্রমের লুঠ। বিছিন্ন ভাবে নানান অঞ্চলে শুরু হল আদিবাসী শক্তির সাথে ব্রিটিশ ও ভারতীয় সামন্তপ্রুভুদের সংঘাত। স্বাধীনচেতা আদিবাসীরা সাফ জানিয়ে দিল তাঁরা না গোলামি করবে ব্রিটিশ শক্তির, না দেবে তাঁদের প্রাণ প্রিয় অরণ্যকে ধ্বংস করতে। লুণ্ঠিত কাঁচামাল সারা ভারতবর্ষ ও ইংল্যান্ডে পৌঁছে দিতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের প্রয়োজন হল সুদীর্ঘ রেল পথ ও সড়ক পথ। যথাক্রমে ১৮৫৩ সালে তৈরি হল ইন্ডিয়ান রেলওয়েজ ও ১৮৫৪ সালে পি.ডাব্লু.ডি। রেলপথে বিস্তারের জন্য প্রয়োজন হল শক্ত কাঠের যার কারনবসত নির্বিচারে কাটা হল ভারতীয় অরণ্যের কোটি কোটি বৃক্ষ। সড়ক পথ নির্মাণে সাফ হতে শুরু করলো অরণ্য ও অরণ্যভূমি। জার্মান ফরেস্টার ডায়াট্রিচ ব্রান্ডিস’কে নিয়োগ করা হয় এই কাজে। পরবর্তীতে আর দুই জার্মানকে এই কাজে ক্রমানুসারে নিয়োগ করা হয়েছিল। ১৮৫৫ সালে ব্যাপক সাঁওতাল বিদ্রোহের সম্মুখীন হয় ব্রিটিশ শক্তি। এই প্রথম একটি বিদ্রোহ অতি অস্ত্রসজ্জা ছাড়াও ভারতের বুকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ভিত নড়িয়ে দিয়েছিল। হাজার হাজার আদিবাসীকে হত্যা করে, অকথ্য অত্যাচার চালিয়ে শেষমেশ বিদ্রোহ দমন করতে হয়েছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের। ব্রিটিশ শক্তি সেই সময়েই স্পষ্ট রূপে বুঝতে পারে সম্মুখ সমরে পরাক্রমশালী ও দুঃসাহসী আদিবাসীদের হাত থেকে অরণ্যের অধিকার কেড়ে নেওয়া সম্ভব নয়। কারণ এই পরাক্রমী জাতির শক্তির গড় হল এই বিস্তীর্ণ অরণ্য। একমাত্র আইন প্রণয়নের মধ্যে দিয়ে ছলে-বলে-কৌশলে এই অধিকার কাড়তে হবে।

১৮৬৪ সালে ভারতবর্ষে প্রথম তৈরি হল বনদপ্তর। যার ফলে খর্ব হয় অরণ্যের উপর আদিবাসীদের অধিকার। ১৮৭৮ সালে প্রথম চালু হয় বন-আইন। যখন বন-আইন নিয়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের নিজেদের মধ্যে আলোচনা হয় তখন এই বন-আইনে লর্ড ডালহৌসি ও ব্যাডেন-পাওয়েলের নিদানে সরাসরি বলা হয় ‘শুধু সরকারের জন্য সংরক্ষিত অরণ্য’ সংক্ষেপে ‘সংরক্ষিত অরণ্য’। অর্থাৎ অরণ্যের উপরে সকারের অধিকার ছাড়া অন্যদের অধিকারের অবশান ঘটানো হল আইনের মধ্যে দিয়ে। তারপরে থেকে শুরু হল গণআন্দোলন। সিংভূম-ছোটনাগপুরের মুন্ডা ও অন্যান্য আদিবাসী সম্প্রদায়, গাঢ়োয়ালে-কুমায়ুনে, পাঞ্জাবের পাহাড়িরা, মধ্যপ্রদেশের বাইগারা, রাঢ় বঙ্গের সাঁওতাল-কুর্মিরা বনের উপর তাঁদের অধিকারের স্বার্থে এক দীর্ঘ লড়াইয়ের সূচনা করেন। বনের উপরে অধিকারের আন্দোলনগুলি উপনিবেশ বিরোধী ও সামন্ততন্ত্র বিরোধী লড়াইয়ে ধীরে ধীরে পরিণত হতে থাকে। যেখানে আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করে সেই সব অঞ্চলগুলিকে আদিবাসীদের হাতে ছেড়ে রাখে সরকার। তবুও এর মধ্যে দিয়েই ১৮৬৪ থেকে ১৯০০ সালের মধ্যে ভারতীয় উপমহাদেশের ১/৫ অংশ অরণ্য চলে যায় বনদপ্তরের হাতে। যার উপর থেকে অধিকার হারায় আদিবাসীরা। ধীরে ধীরে অরণ্য থেকে উচ্ছেদ করা হতে থাকে আদিবাসীদের। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ভারত থেকে চলে গেলেও অরণ্যের উপর আদিবাসীদের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা হয়নি এখনো পর্যন্ত। এসেছে একের পর এক বন-আইন যার মধ্যে দিয়ে আদিবাসীদের উপর নেমে এসেছে আরও বর্বর আক্রমণ। দেশীয় ও বৈদেশিক কোম্পানিদের মুনাফার স্বার্থে তাদেরকে ভারত সরকার দিয়েছে অরণ্যের অধিকারের উপর খুলা ছুট। খনিজ উত্তোলনের স্বার্থে ধ্বংস করা হচ্ছে হেক্টরের পর হেক্টর বনভূমি। নষ্ট হয়ে যাচ্ছে জীববৈচিত্র্য। উচ্ছেদ করা হচ্ছে অরণ্যের পাহারাদার আদিবাসীদেরই তাঁদের জল-জঙ্গল-জমি থেকে। এই উচ্ছেদের ইতিহাস বহু পুরনো। ১৯৫১ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত এই তথাকথিত স্বাধীন দেশের সরকার কর্পোরেট প্রুভুদের সুবিধার্থে অরণ্য থেকে প্রায় দুই কোটি মানুষকে উচ্ছেদ করেছে যার মধ্যে ৪০% আদিবাসী অর্থাৎ সংখ্যাটা গিয়ে দাঁড়ায় ৮৫ লক্ষ।

নব্বই দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে নয়া উদারনৈতিক অর্থনীতির ভারতে প্রবেশ। এর সাথে সাথে বহুগুণ বেড়ে যায় অরণ্য ও আদিবাসী জাতির উপর রাষ্ট্রীয় আগ্রাসন। যে সব অঞ্চলে আদিবাসীরা রুখে দাঁড়িয়েছে সেখানে আদিবাসী জল-জঙ্গল-জমি লুঠ করতে কার্যকারি করা হয়েছে সাড়বাজুলুম। রনবীর সেনাদের মত সংগঠিত পেটোয়া গুন্ডারা পুড়িয়ে দিয়েছে আদিবাসীদের ঘরবাড়ি, সর্বহারা করে দেওয়া হয়েছে শান্তিপ্রিয় আদিবাসীদের। আন্দোলনকারীদের দেগে দেওয়া হয়েছে মাওবাদী তকমায়। অপারেশন গ্রিনহান্ট লাগু করে নির্বিচারে আদিবাসীদের রক্তে হাত ধুয়েছে এই রাষ্ট্রশক্তি। এখনো সেই হত্যা ক্রমশ বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে। কিন্তু কাদের স্বার্থে এই হত্যা যজ্ঞ? এক এবং এক মাত্র বড় বড় ব্যবসাদার অর্থাৎ পুঁজিপতিদের স্বার্থে। আম্বানি-আদানি-টাটা-বিড়লা-বেদান্তর মত বড় বড় কোম্পানীগুলির স্বার্থে। অরণ্য ও আদিবাসীদের উপর সেই আগ্রাসন আজও অব্যাহত। সেনসেক্স থেকে ‘সারি ধর্ম’ বাদ দেওয়া হয়েছে। ধর্মচূত্য করে আদিবাসীদের ফেলা হচ্ছে হিন্দু ধর্মের তালিকায়। ২০১৯ সালে নয়া-পরিবেশ ড্রাফ্‌ট এর মধ্যে দিয়ে চলছে প্রায় ১৯ লক্ষ আদিবাসীদের অরণ্য থেকে উচ্ছেদের কাজ। এই উচ্ছেদ সম্পর্কে উচ্চ আদালত প্রত্যেক রাজ্যের কাছে থেকে রিপোর্ট চেয়ে পাঠায়। সেখান পশ্চিমবঙ্গ থেকে ৫০২৮৮ জন আদিবাসী ও ৩৫৮৫৫ জন অন্যান সম্প্রদায়ের দাবি বাতিলের কথা অর্থাৎ একপ্রকার অরণ্য থেকে উচ্ছেদের কথা বলা হয়। অথচ এই পশ্চিমবঙ্গে বিগত দুই বছরে অরণ্যের হ্রাস ঘটেছে ১৯% শুধু মাত্র জঙ্গলমহল অঞ্চলে ও ১১% দার্জিলিং পার্বত্য অঞ্চলে।

আসলে একসময় ব্রিটিশ জেনেছে আজ এই দেশের সরকারও জানে যতদিন আদিবাসীদের অধিকার থাকবে জল-জঙ্গল-জমির উপর ততদিন তাঁরা রাষ্ট্রীয় ধংস যজ্ঞের হাতে তুলে দেবেনা তাঁদের সম্পদকে। যেভাবে ‘অসভ্য-বর্বর’ বলে দাগিয়ে দিয়ে তাঁদের দূরে রাখা হয়েছে এতদিন ধরে, আবারও সেই একই ছকে পরিকল্পনা রচনা করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় ও কর্পোরেট মদত পুষ্ট এন.জি.ও গুলি সেন্দ্রা প্রথা কে বলে চলেছে ‘শিকার উৎসব’। সেই কথা শুনে তথাকথিত ভদ্র সমাজের চোখে কুম্ভীরাশ্রু। তাঁরাও নেমে পড়েছে বন্য প্রাণী রক্ষার্থে আদিবাসী প্রথা বন্ধের দাবিতে। তোতাপাখির মত তারাও বলে চলেছে রাষ্ট্রের শেখানো বুলি ‘শিকার উৎসব – শিকার উৎসব’। আসলে এই রাষ্ট্র সংগঠিত ভাবে জনমানসে আদিবাসী বিরোধী এক মতামতকে ছড়িয়ে দিতে চাইছে এই ‘শিকার উৎসব’ শব্দটিকে কাজে লাগিয়ে। পূর্বেই বলেছি ১৯ লক্ষ আদিবাসীদের অরণ্য থেকে উচ্ছেদ করার কাজ এখনো এই রাষ্ট্রের বাকি। অর্থাৎ জনমানসে আদিবাসীদের অরণ্য বিরোধী বলে চিহ্নিত করতে পারলে সে কাজ যে সহজ হবে তা রাষ্ট্র বিলক্ষণ জানে। তারই সূচনা হিসাবে ‘শিকার উৎসব’ যা আসলে ‘সেন্দ্রা প্রথা’, তা বন্ধ করার চেষ্টা।

ইতিহাস সাক্ষী যতদিন আদিবাসীদের হাতে এই জল-জঙ্গল-জমির সম্পূর্ণ অধিকার থেকেছে ততদিন অরণ্য বিকশিত হয়েছে প্রকৃতির নিয়মে। আসলে ‘সেন্দ্রা’র মত প্রথা অতীতে মানুষ ও প্রকৃতির সহাবস্থানের সামঞ্জস্য টিকিয়ে রেখেছিল। আজ যদি আমরা আবারও প্রকৃতি ও মানুষের সহাবস্থানের সামঞ্জস্য ফিরিয়ে আনতে চাই তাহলে বেশি করে প্রয়োজন ‘সেন্দ্রা’র মত প্রথার। আমাদের বুঝতেই হবে এই অরণ্য ধ্বংসের সব থেকে বড় কারিগর এই রাষ্ট্র ও পুঁজিবাদী ব্যবস্থা। তাই আমাদের আবার গণআন্দোলন গড়ে তুলে পরাজিত করতে হবে ধংসের ব্যবস্থাকে। সৃজনের ব্যবস্থার উপর দাঁড়িয়ে অরণ্যের উপর সম্পূর্ণ অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে আদিবাসীদের হাতে। আরও বেশি বেশি করে জনমানসে এগিয়ে নিয়ে আসতে হবে ‘সেন্দ্রা’র মত ঐতিহ্যবাহী ইতিহাসকে। প্রকৃতি তাঁর অধিকার বুঝে নিতে শুরু করেছে তা হয়তো এই মহামারির মধ্যে দিয়ে আপনারা তা বুঝতেই পারছেন। আমরা যদি সহাবস্থানের দিকে আবার ফিরতে না শুরু করি তাহলে এক বড় বিপর্যয় অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য। সুস্থ থাকতে, শান্তিতে থাকতে এখনই সময় পক্ষ বেছে নেওয়ার। আপনি রাষ্ট্রীয় পক্ষে থেকে মেকি উন্নয়নের নামে প্রকৃতি ধংসের কর্মকান্ডে লিপ্ত হবেন, না কি প্রকৃতি ও অরণ্যসন্তান আদিবাসীদের পক্ষে থেকে গেয়ে উঠবেন – গাঁও ছোড়ব নেহি… জঙ্গল ছোড়ব নেহি… মা-মাটি ছোড়ব নেহি… লড়াই ছোড়ব নেহি…