অনাহুত

লেখা: বিষ্ণু মন্ডল

প্রতিবারই নিয়ম করে স্কুলে ছাত্র ছাত্রীদের চাল, আলু দেওয়ার সময় চলে আসে ,এই মহিলাটি ।

না কোন অভিভাবিকা নন, বিদ্যালয়ের পাশেই বাড়ি,বাড়ি বলতে একটা ছোট্ট খড়ের চালা।

নাম জিজ্ঞেস করায়, বলে” ছবি”, সত্যিই ছবি বটে, মনে কোন কুটিলতা বা জটিলতা নেই, স্পষ্ট জবাব দেয়।

“মুখে মাস্ক নেই কেন?, জানতে চাইলে স্পষ্ট বলে ,মাস্টাররা পরে এসেছে তো, ওর না পরলেও চলবে।”অনেক জোরাজুরি করলে শেষ পর্যন্ত শাড়ি দিয়ে মুখ ঢাকে।

এদের বেশি বোঝানো যায় না, তাই কথা পাল্টাতেই হয়, কেন স্কুলে আসা জানতে চাইলে বলে, ওর যে পেট আছে স্কুলে পড়া ছেলেমেয়ের মতো, তাই ওকেও চাল ,আলু এবং অন্যান্য সবকিছুই দিতে হবে।

কিন্তু ছাত্র ছাত্রীদের জন্য স্পষ্ট বরাদ্দ জিনিস কীভাবে দেওয়া যাবে, অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে বলে চালে এসে দাঁড়ায়, ওকে অন্তত চাল দিতেই হবে।

শেষে আমাদের সহৃদয় ভারপ্রাপ্ত প্রধানশিক্ষক সবার শেষে চাল দেব বলে ওকে আস্বস্ত করে।এই আশ্বাস বাণী শুনে ও চুপটি করে দাঁড়িয়ে থাকে ,কখন আসবে ওর পালা সেই অপেক্ষায়।

এরই মাঝে জানতে পারলাম, তিন ভাই আছে ওর, এখানে ছোট ভাইয়ের কাছেই থাকে।প্রাপ্ত বয়স্ক অবস্থায় বিয়েও হয়েছিল ভিন জাতে, বিহারীদের সাথে, তারপর বিয়ের কিছুদিন পরেই বর তাড়িয়ে দিয়েছে, কোন সন্তান নেই।

শরীর স্বাস্থ্য, ভালোই দেখে সাহস করে জিজ্ঞেস করেছিলাম,” কাজ করে অর্থ উপার্জন করেও তো খেতে পারে লোকের বাড়িতে”।
“বলল, কাজ নাকি আগে করত, তারপর যখন থেকে তার প্রেসার বাড়ার জন্য মাথা ঘুরে পড়ে গিয়েছিল তারপর থেকে আর ভারী কাজ করতে পারে না, এইভাবেই একপ্রকার ভিক্ষে করেই চলে।”

প্রতি সপ্তাহে গ্রামের মধ্যে হাটে ঘুরে ঘুরে যার কাছে যেমন পায় দানে সবজি ,আলু জোগাড় করে, আর তারপর নিজেই কোন রকম ফুটিয়ে, আলু সেদ্ধ বা এক সবজি ভাত খায়।

এর আগেও স্কুলে যখন রান্না হত, ছেলেরা আসতো, তখনও অনেকবারই টিফিনে থালা হাতে ভাত, তরকারি, ডাল নিয়ে যেতে দেখেছি।

একটা বিশ্বাস ছবিকে বারবার নিয়ে আসে স্কুলের প্রাঙ্গনে, অন্য কেউ কিছু বলে তাড়িয়ে দিলেও ,স্কুলের মাস্টাররা তাড়াবে না, একটু ফুটিয়ে খাওয়ার মতো চাল ঠিক দেবেই।আজও সেই বিশ্বাসই দেখলাম ওর চোখে মুখে।

অনেকের চোখেই এই কাজটি হয়ত ভুল, আইনত তো ভুলই করছি আমরা,কিন্তু বিশ্বাস করুন, এইরকম ভুল করে মনে কিছুটা হলেও শান্তি আসে।এর জন্য বিদ্যালয়ের ছেলে মেয়েদের বরাদ্দ থেকে কিছুই কমানো হয় না, সামান্য চাল প্রতি মাসে অল্প করে দেওয়ায় যায়।

খুব আক্ষেপ ঝরে পড়ল ছবির মুখে, কেউ তাকে সরকারি “শ্রী যুক্ত” অনুদানের লিস্টে নাম লিখিয়ে দেয় না, তাহলে তো মাস শেষে কিছু টাকা পেত।কেন জানি না, কেউ সাহায্য করে না, হয়তো কিছু বাধ্যবাধকতা আছে, বা এটাই নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে, যাদের সত্যিই অনুদানের “ভাতা বা শ্রী” দরকার তারা এখনো সেটা অর্জনই করতে পারে না।

দান করছি সরকারের জিনিস, আর সেটা নিয়ে ফুটানি করছি বা বড় বড় কথা লিখছি, এমন কিছু ভাববেন না, গত দশ বছর বা তার বেশি সময় ধরে চলছে এটা, এতদিন বলার প্রয়োজন মনে হয় নি, বলেই বলিনি, আজ কেন বললাম তাহলে?

“ছবি “যেন আমার একার মনের মধ্যে ছবি হয়ে না থাকে,সেইজন্যই।

যদি রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক ভাবে ,তার “শ্রী যুক্ত ভাতা” পাওয়ার পথ প্রশস্ত হয়,সেই ভেবেই লেখা,কারন এখনো তার পূর্বের অবস্থার বিন্দুমাত্র পরিবর্তন হয় নি, তাই যদি আগামী দিনে কিছুটা পরিবর্তন হয় সেইভেবেই।

মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী সহৃদয়া হয়ে সদ্য প্রয়াত বিখ্যাত বেসরকারি ক্ষেত্রে কর্মরত সাংবাদিকের সদ্য বিধবা স্ত্রীকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন সরকারিভাবে এইরকম একটা খবর শুনেছিলাম। একেও যদি স্থানীয় কোন নেতা, বা প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তিরা এদের জন্য বরাদ্দ সরকারি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়, তাহলে এইভাবে ছবিকে ঘুরতে হবে না এই আশায়।

লিখলাম লেখাটা “ছবি”র দিন বদলের আশায়।

লেখা:বিষ্ণু মন্ডল
মতামত ব্যক্তিগত