Category Archives: বাংলা প্রবন্ধ

সাঁওতালি কাব্য সাহিত্যের কবিগুরু সাধু রামচাঁদ মুর্মু

“দেবন তিগুণ আদিবাসী বীর”সাঁওতালি ভাষার বিকাশের জন্য সাধু রাম চাঁদ মুর্মুর যে ভাবে আত্মনিয়োগ করেছেন বোধহয় আজ পর্যন্ত আর কেউ করতে পারেনি। সাধু রাম চাঁদ মুর্মু কে সাঁওতালি কাব্য সাহিত্যের কবিগুরু বা মহাকবি বলা হয়।






সাধু রাম চাঁদ মুর্মু পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বর্তমান ঝাড়গ্রাম জেলার শিলদা নিকটবর্তী কামারবাঁদি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন । বাংলা ১৩০৪ সালের বৈশাখ মাসের ১৬ তারিখে এই মহান কবির জন্ম। সাধু রাম চাঁদ মুর্মুর পিতার নাম মোহন মুর্মু, মা কুনি মুর্মু। সাধু রাম চাঁদ মুর্মুর চার ভাই বোনের ছিলেন, তাঁর মধ্যে সবার বড় ভাই দুবরাজ মুর্মু, মেজ ভাই ধনঞ্জয় মুর্মু, বোন মুগলি আর সবার ছোট হলেন কবি সাধু রাম চাঁদ মুর্মুর।






১৯০৬ সালে তাঁকে গ্রামের স্কুলে ভর্তি করা হয়। সাধু রাম চাঁদ মুর্মুর বাল্য অবস্থা থেকে মেধাবী ছিলেন। মেদিনীপুর জেলায় ভীমপুর মিশনারীগণ সাঁওতাল ছেলেমেয়েদের শিক্ষার উদ্দেশ্যে আবাসিক স্কুল স্থাপন করেন। স্কুলের পুরনো রেকর্ড থেকে সাধু রাম চাঁদ মুর্মুর নাম পাওয়া গেছে অর্থাৎ তিনি এই স্কুলে পড়তেন।স্কুলে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে নানা রকম হাতের কাজ শেখানো হতো, এবং পুরানো রেকর্ড অনুযায়ী সাধু রাম চাঁদ মুর্মু ভালোভাবেই ছুতার মিস্ত্রির কাজ, তাঁতের কাজ, এবং বিভিন্ন কারিগারি কাজে শিখেছিলেন এবং লেখাপড়া চিরদিনই পারদর্শী।






সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে সাধু রাম চাঁদ মুর্মুর জীবনেও পরিবর্তন আসে, ব্যক্তিগত জীবনে সাধু রাম চাঁদ মুর্মুর ছিলো দুই বিবাহিত স্ত্রী । প্রথম পক্ষের নাম মানকা আর দ্বিতীয় পক্ষের নাম কি পুটি। প্রথম পক্ষের স্ত্রীর তিন ছেলেমেয়ে কালিপদ , চুনারাম , কুনি। দ্বিতীয় পক্ষ স্ত্রী তিন সন্তান ধনঞ্জয় , ফুতু , মেয়ে কাকা। সাধু রাম চাঁদ মুর্মুর শুধু সান্তালি ভাষা সাহিত্য বিকাশের জন্য খাওয়া পরা চিন্তা না করে মন প্রাণ দিয়ে সাহিত্যচর্চার আত্মনিয়োগ করে গেছেন। সাধু রাম চাঁদ মুর্মুর লেখা “” দেবন তিঙ্গুন আদিবাসী বির “”।






আজ বাংলা-বিহার-উরিষ্যা আসামের ও বাংলাদেশ সাঁওতালদের মুখে মুখে শোনা যায়। সমাজ এবং জাতির প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা তাঁর ছিল বলেই এ ধরনের গান তিনি রচনা করতে পেরেছেন যা শুনলে আজও সান্তালদের মনে এক অন্য ধরনের অনুভুতি জায়গায়। গানটি সাঁওতালদের জাতীয় সংগীত হিসেবে আদৃত আছে। সাধু রাম চাঁদ মুর্মুর বুঝতে পেরেছিলেন , সাহিত্য ছাড়া কোন জাতির বিকাশ অসম্ভব ।

সান্তালি সাহিত্যের বিকাশ ও জাতির বিকাশের জন্য, বাড়ি-ঘর আত্মীয় পরিজন ছেড়ে আমরণ সাহিত্য-সাধনার নিজেকে ব্যাপৃত রেখেছিলেন এবং যা দিয়ে গেছেন তার প্রকৃত মূল্যায়ন এতদিন হয়নি। পাশাপাশি সাধু রাম চাঁদ মুর্মুর এও বুঝতে পেরেছিলেন মাতৃভাষার শিক্ষা ছাড়া কোন জাতি সার্বিক উন্নয়ন অসম্ভব । তাই তিনিই সর্বপ্রথম মাতৃভাষার শিক্ষার জন্য সাঁওতালি ভাষার স্বতন্ত্র লিপি “” মঁজ দাঁদের আঁক”” তৈরি করেছিলেন ১৯২৩ সালে।






“মঁজ দাঁদের আঁক” এই লিপি বা বর্ণ মালা সাঁওতালি ভাষার উপযোগী হয়েছিল। পরবর্তীতে কালে সেই বর্ণমালাতেই তাঁর সাহিত্য সম্ভার রচনা করেন। সাধু রামচাঁদ মুর্মু তৈরি করা বর্ণমালা সাঁওতাল সমাজে কাছে আজও অপরিচিত। সেই সময় অর্থভাবের জন্য এই লিপির ব্লক তৈরি করা ও প্রচার করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। সাঁওতাল সমাজে এটাই ছিল সবচেয়ে প্রথম এবং প্রাচীন লিপি। জীবিত কালে তিনি তার সাহিত্যকীর্তিকে আর্থিক অনটনের জন্য প্রকাশ করে যেতে পারেননি। দীর্ঘদিনের পান্ডুলিপি অরক্ষিত অবস্থায় ছিল।






তার মৃত্যুর পরে তার নামাঙ্কিত “” সাধু রামচাঁদ উইহৌর বাথান “” (সাধু রাম চাঁদ স্মৃতি রক্ষা কমিটি) এবং মারাংবুরু প্রেসের প্রচেষ্টায় এই পান্ডুলিপি গুলা গ্রন্থাকারে প্রকাশ পায়। ১) সারি ধরম পেলেন পুঁথি ১৯৬৯২) অল দহ অনড়হেঁ ১৯৭৮৩) লিটৌ গোডেৎ ১৯৭৯৪) সংসার ফেঁদ ১৯৮২৫) ঈশরড় ১৯৮৫ আজও প্রায় অনেকেরই অজানা যে সাধু রাম চাঁদ মুর্মুর “”সাধু”” শব্দ টা ব্যবহারের কারণ।






সানতালি সাহিত্যের ইতিহাস বই থেকে পাওয়া তথ্য অনুসারে – সাধু রাম চাঁদ মুর্মুর সঙ্গে যারা কাটিয়েছেন তারা অনেকে বলেন, বৃদ্ধা বয়সে সংসারের প্রতি কবির বিতৃষ্ণা সৃষ্টি হয় তাই কোলাহল থেকে দূরে প্রকৃতির নির্জনে কোলে কুঁড়ে ঘর বানিয়ে তাতে একাকি দিন যাপন করতেন। সাধুসন্ন্যাসীদের মতো জীবন শুরু করেন। জপ- তপা তাঁর জীবনের মূল উদ্দেশ্য। সাধুদের মত দাড়ি রাখেন, সাদা কাপড় পরিধান করতেন। সাধুর মতন জীবন যাপন করার জন্য তার নামের আগে সাধু শব্দ ব্যবহার হয়ে আসছে। কবি সাধু দার্শনিক , শিল্পী , প্রকৃতিপ্রেমী , সমাজসেবী , সমাজ সংস্কারক , গবেষক সাধু রামচাঁদ মূর্মু বাংলা ১৩৬১ বঙ্গাব্দে ২৯ শে অগ্রহায়ণ , ইংরেজির 1955 সালে দেহত্যাগ করেন।






বাংলা ১৩৭৭ সালের ১৫ই ভাদ্র তারিখের আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশি “সাঁওতালী বর্ণমালা ও সাহিত্য” শীর্ষক একটি প্রবন্ধে প্রাবন্ধিক লিখেছেন –“..পশ্চিমবাংলায় সাধু রামচাঁদ এবং উড়িষ্যার শ্রীযুক্ত রঘুনাথ মুরমু পৃথক পৃথক ভাবে সাঁওতালী বর্ণমালাতৈরী করেন। সাধু রামচাঁদের বর্ণমালা সাঁওতাল সমাজে অপরিচিত এবং অর্থাভাবে এই লিপির ব্লক তৈরী করে প্রচার করা সম্ভব হয়ে উঠে নি। এই বর্ণমালা রঘুনাথবাবুর তুলনায় প্রাচীনতর…।” ১৯২৩ সালে নির্মিত সাধু রামর্চাদের লিপির নাম “মজ দাঁদের”। এই লিপিতে তিনি “সারি ধরম” (শ্বাশ্বত ধর্ম গ্রন্থখানি রচনা করেন, যার খণ্ডিত পাণ্ডুলিপি আবিষ্কৃতহয়েছে।

জংগলমহলের হাওয়া

সকালে ঘুম থেকে উঠে পাড়ার একমাত্র চা দোকানে বসে চা খেতে খেতে গল্প করছিলাম, এমন সময় আমার মোবাইল ফোনটা বেজে উঠলো। ফোনটা হাতে নিয়ে দেখলাম একটা অচেনা নাম্বার থেকে ফোন আসছে। গলা ছেড়ে আমি ফোনটা রিসিভ করলাম। ফোনের অপরপ্রান্ত থেকে একটা চেনা গলার আওয়াজ পেলাম, বুঝতে কোনো অসুবিধা হলো না, দুরসম্পর্কের আমার এক দাদা কলকাতায় থাকে, তারি ফোন এটা। সামান্য কুশল বিনিময় হওয়ার পর সে আমাকে জিজ্ঞেস করল ভাই, “তোমাদের জঙ্গলমহলের ভোটের বাজার কেমন গরম?”

আমি বললাম “আমাদের জঙ্গলমহল এমনিতেই খুব গরম। তুমি তো শুনেছো আমাদের জঙ্গলমহলের এখনকার অবস্থা। সেটা নিয়ে আর কি বলব!”

দাদা বলল , “কি খবর ? নাতো আমি কোন খবর জানি না।”

“জানো তো, আজকাল শহরাঞ্চল ছড়িয়ে গ্রামেগঞ্জে একটা কথা প্রচলিত হয়ে উঠেছে। আমরা তো জানি, শব্দ দূষণ, বায়ু দূষণ, জল দূষণ এর কথা কিন্তু আজকাল আরেকটা দূষণ এসে হাজির সেটা হল সংবাদ দূষণ। আজকাল টিভিতে হোক বা খবরের কাগজ সব জায়গাতেই আজব আজব খবর ই দেখা যায়। সে সমস্ত গাঁজাখুরি খবর এর মাঝেই ভালো খবর হারিয়ে যায়। তুমি দেখে থাকবে প্রত্যেক সংবাদপত্রে র খবর, কোন নায়িকার সকালে কি হলো, তো কোন নায়িকার উমুক হয়েছে ইত্যাদি। “

“নায়িকার কথা বলতে একটা কথা মনে পড়ে গেল। আমাদের টলিউডে আগে নতুন নতুন অভিনেতা অভিনেত্রী তৈরি হতো। আজকাল দেখো টলিউডে নতুন নতুন রাজনীতির নেতা তৈরি হচ্ছে। যাকগে সে কথা, কি যেন বলছিলে?” আমার কথার মাঝেই দাদা কথাটা বলে উঠল।

আমিও বললাম “কথাটা মন্দ বলনি। বলছিলাম আমাদের জঙ্গলমহলের এখন আবহাওয়া খুব গরম। তোমাদের শহর কলকাতা তো নয় এটা।”

“সে কি বলো, এখন থেকেই ঝগড়া ঝাটি শুরু হয়ে গেল নাকি?”

“না, ঝগড়াঝাঁটি হবে কেন! সেই দিক থেকে আমাদের জঙ্গলমহল কিন্তু অনেকটাই শান্ত। আসলে যে কথাটা বলছিলাম, আমাদের দক্ষিণবঙ্গের অযোধ্যা পাহাড় থেকে শুশুনিয়া পাহাড় সাথে ঝিলিমিলি বারো মাইল জঙ্গল এখন আগুনের লেলিহান শিখায় দগ্ধ হয়ে যাচ্ছে। সেই আগুনের লেলিহান শিখা ছোট ছোট সবুজ গাছ থেকে শুরু করে পশু পাখিদের পুড়িয়ে জারখার করে দিচ্ছে। কত যে নিরীহ প্রাণীর জীবন হলো বলিদান তার কোন হিসাব নেই। পাড়ার একটা কুকুর মরলে, পশুপ্রেমী মানুষ জন এতক্ষণ হয়ত মোমবাতি জ্বালিয়ে প্রতিবাদে গর্জে উঠতেন। কিন্তু এখানে হাজার হাজার নিরীহ পশু পাখি, গাছগাছালি; যারা আমাদের বেঁচে থাকার জন্য নিরলস ভাবে অক্সিজেন সরবরাহ করে চলেছে তাদের জন্য সংবাদপত্র থেকে ইলেকট্রনিকস মিডিয়ায় সামান্য কোন খবরও নেই। জানি না সাংবাদিকদের ক্যামেরা গুলো কেন যে সব নায়ক নায়িকার পেছনেই লেগে থাকে! সেই আগুনের লেলিহান শিখায় পুড়ে খাক হয়ে যাচ্ছে আমাদের জঙ্গলমহলের মানুষের স্বপ্ন। আগুলের লেলিহান শিখার আঁচ সত্যিই গরম করে তুলেছে জঙ্গলমহলের আবহাওয়া। এ জঙ্গলকে আঁকড়ে ধরে আবর্তিত হয়েছে সাঁওতালদের জীবন জীবিকা। জঙ্গল পুড়লে শহুরে বাবুদের আর তাতে কি আসে যায়! আজকাল নাকি শুনেছি, অক্সিজেন কিনতে পাওয়া যায় তাই তো জঙ্গল পুড়লে কারো মাথা ব্যথা থাকার কথা নয়। জঙ্গল থেকে সাঁওতালদের অধিকার কেড়ে নেওয়ার জন্য সরকার নাকি আইন আনছে, এবার বলো সাঁওতালদের জীবিকার কথা জঙ্গল রক্ষা করা সরকারের কাছে একটা অযৌতিক কাজ মনে হতে পারে। তাই তো আমরা দেখেছি, মেলার জন্য অনুদান, খেলার জন্য অনুদান, পুজোর জন্য অনুদান, ক্লাবের জন্য অনুদান দেওয়ার সময় টাকার অভাব হয়না। আমাদের সবুজ সরসতা রক্ষা করার প্রয়োজনে কোন অনুদান আসে না। জানিনা তাতে মা ভবানীর ভান্ডারে টান পড়বে নাকি! এদিকে সবাই বলে চলেন, “জঙ্গল হলো আমাদের ফুসফুস।” আমাদের তো দেখে মনে হয় ফুসফুস নয় এটাকে তারা ভাবেন ফানুস।”

“সত্যিই এটা খুব খারাপ খবর। কোনদিন সংবাদ পত্রিকাগুলোতে এই খবর আমার চোখে পড়েনি। আমরা তো সুন্দর বন বাঁচানোর জন্য কত টাকাই না খরচ করি তার কিছুটা হলেও যদি জঙ্গল রক্ষা করার কাজে খরচ হতো তাহলে আজকে এই অবস্থা হতোনা। এই কটা দিন আগেই বনবিভাগ থেকে ‘ বন সহায়ক ‘ পদে নিয়োগ তো হলো, তাদের তাহলে কি কাজ দেওয়া হলো? আমিতো ভাবছিলাম জঙ্গল রক্ষা করতেই তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।”

“জানি না, কি কাজ দেওয়া হয়েছে। আমি তো কোনদিন দেখিনি জঙ্গল দেখতে কোনদিন কোন ফরেস্ট আফিসার এসেছে বলে। ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট এর কি কাজ সেটাই জানি না।”

যাক গে সে কথা, এখন তো আর ভেবে লাভ নেই। সামনের বছর দেখ, যাতে সকলকে সচেতন করা যায়। আর কি যেন একটা বলছিলে, আমাদের সাওতালদের জীবন জীবিকা জঙ্গলকে আঁকড়ে বেঁচে আছে। কেন কোন উন্নয়ন কি আজও হয়নি?

ক্রমশ…..

REV. P. O. BODDING সাহেব, সাঁওতাল ও সাঁওতালী

পুরো নাম paul olaf Bodding.(পৌল অলাফ বোডিং ) । যাকে সংক্ষিপ্তভাবে P.O. Bodding নামে ডাকা হয়। তবে সান্তাল আদিবাসীরা তাকে পিয়ো বোডিং ( pieạ boḍiń) নামে ডাকে। P.O. Bodding সাহেবের সময়কালে সান্তাল আদিবাসীরা আজকের মতো ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত ছিলনা। তাই ইউরোপিয়ান ভাষাগুলির শব্দকে নিজেদের মতো করেই ( santalized) উচ্চারণ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতো। যারফলে P.O. Bodding না বলে, তাঁর নামটি পিয়ো বোডিং নামেই সবাই চিনতো ও জানতো।

কিন্তু সান্তালি ভাষায় “পিয়ো ” ( pieạ) শব্দের বাংলা অর্থ হচ্ছে – “হলুদে পাখি ”। সান্তালরা সাধারণত হলুদে পাখিকে বার্তাবাহক পাখি হিসেবেই বিশ্বাস করে। বাড়ির পাশে হলুদে পাখি ডাক দিলেই, সান্তালরা বিশ্বাস করে -” আজ কোন অতিথি আসতে পারে “।

বাড়িতে আমার মাও প্রকৃতির ওপর দারুন বিশ্বাসী। হলুদে পাখির ডাক শুনলেই, অতিথি আগমনের জন্য প্রতীক্ষা করেন। সান্তাল আদিবাসীদের এই প্রকৃতি বিশ্বাসকে হয়তো অনেকেই বলবেন, এই আধুনিক ডিজিটাল যুগেও সান্তালরা সেই আদিমেই রয়ে গেল। যাহোক, আদিম – ডিজিটাল যুগ নিয়ে আমি বিতর্কে যাবোনা।

তবে পি.ও বোডিং কিন্তু সান্তাল জাতির জীবনে একজন শিক্ষার বাহক কিংবার শিক্ষার দূত হিসেবে এসেছিলেন। আর এজন্যই আমরা বলতে পারি, পি. ও. বোডিং এর নাম তৎকালীন ইংরেজি অজ্ঞ সান্তালরা পিয়ো বোডিং নাম দিয়ে সম্ভবত কোন ভূল করেনি।
.

এই পি.ও. বোডিং ছিলেন একজন ভাষাবিদ, লোকাচারবিদ, গবেষক, বিজ্ঞানী, এবং একজন নরওয়েজিয়ান মিশনারী। তিনি ২ নভেম্বর ১৮৬৫ সালে নরওয়ের গজোভিক শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম এডওয়ার্ড ওলসেন বোডিং এবং মা বিজি এমিলি ওয়েইনভোল্ট। বাবা ছিলেন গজোভিক শহরের একজন বই বিক্রেতা। সান্তালি ভাষা ও সাহিত্য গবেষনার অগ্রদূত lars olsen skrefsrud ছিলেন P.O. Bodding – এর বাবার বন্ধু। এই L.O. Skrefsrud কে সান্তালরা কেরাপ ( kerap) সাহেব নামেই জানে। ১৮৮১-৮২ সালে skrefsrud নরওয়েতে থাকাকালে P.O. Bodding তাঁর কাছে ভারতের সান্তালদের সম্পর্কে জানতে পারেন। তিনি ঐ সময় সান্তালদের কাছে আসার জন্য তাঁর ইচ্ছা ও আগ্রহের কথা প্রকাশ করেন। পি.ও. ১৮৮৩ সালে অসলো বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক এবং ১৮৮৯ সালে ক্রিশ্টিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক হন। ১৮৯০ সালের জানুয়ারি মাসে তিনি সান্তাল পারগানাতে যান এবং একই বছরের ডিসেম্বর মাসে মহুলপাহাড়িতে মিশনের দায়িত্ব গ্রহন করেন। ১৯০৯ সালে lars olsen skrefsrud মারা গেলে, সান্তাল মিশনের নেতা হিসেবে পি.ও. বোডিং ক্ষমতা গ্রহন করেন এবং সান্তাল মিশনের প্রশাসনিক কেন্দ্র টি ডুমকা জেলাতে স্থানান্তর করেন।

.
সান্তাল ভাষাকে নিয়ে গবেষণা করার প্রবল ইচ্ছা ও আগ্রহ ছিল তার। তিনি ৪৪ বছর ধরে নিরলস ভাবে সান্তালদের মধ্যে থেকে কাজ করে গেছেন। সান্তালি ভাষা – ভাষী লোকজনের জন্য তিনিই প্রথম সান্তালি বর্ণমালা ও ব্যাকরণের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি দাড় করিয়েছেন।
১৯২৩ সালে তিনি পাঁচটি ভলিউমের একটি সান্তালি অভিধান তৈরী করেন। সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একজন গবেষক হিসেবে P.O. Bodding সান্তাল জাতির জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে গেছেন। সান্তালদের মুখে মুখে প্রচলিত সাহিতের লিখিত রুপ দান করেছেন।


তার সৃষ্টিকর্ম গুলির মধ্যে হলো :

(1) studies in santal medicine and connected folklore.
(2) santal medicine.
(3) Folklore of the santal parganas.
(4) A chapter of santal folklore.
(5) A santal dictionary.
(6) The santals and disease.
(7) Santal riddles and witchcraft among the santals.
(8) Santal folk tales.
(9) Traditions and institutions of the santals( hoṛ koren mare hapṛam koak̕ katha .)
(10) Kukli puthi.
(11) Seren’ puthi.
(12) Hor kahniko.
(13) Baebel translation.
(14) Materials for a santali grammar.
(15) A santali grammar for Beginner’s.
এছাড়াও আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ রচনা সৃষ্টি করে গেছেন।

পি.ও. বোডিং ১৮৯৩ সালে বাংলার এশিয়াটিক সোসাইটির সদস্য এবং ১৮৯৪ সালে ক্রিশ্টিয়ানা ( বর্তমানে Norwegian academy of sciences) – এর সদস্য হন। ১৯০৭ সালে তিনি ব্রিটিশ ও ফরেন বাইবেল সোসাইটি লন্ডনের সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হন।

তিনি ১৯০১ সালে king Oscar স্বর্নপদক লাভ করেন। ১৯১০ সালে order of st. Olav – এর প্রথম শ্রেনীর নাইট উপাধি লাভ করেন। ১৯১২ সালে তিনি দিল্লী দূর্বার ( Delhi Durbar) পুরস্কার পান এবং ১৯৩১ সালে ফ্রেডজোফ নানসেন পুরস্কার লাভ করেন।

এই প্রখ্যাত বিজ্ঞানী ও গবেষক ভারতের ঝাড়খণ্ড, বিহার, আসাম, উড়িষ্যা, পশ্চিমবঙ্গ, রাজ্যগুলিতে এবং বাংলাদেশ ও নেপালের সান্তালদের নিকট অত্যন্ত জনপ্রিয় একজন ব্যক্তি।
স্ক্যান্ডিনেভীয় দেশগুলিতেও ( নরওয়ে, ডেনমার্ক, সুইডেন, ফিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড, দেশগুলিকে স্ক্যান্ডিনেভীয় দেশ বলা হয়) তিনি এখনও বেশ সুপরিচিত। ভারতের ঝাড়খণ্ড রাজ্যের central university র সহকারী অধ্যাপক শিল্পী হেমব্রম বলেন, ” পি.ও. বোডিং আমাদের কাছে একজন দেবতার মতো “.।

আরো জানা যায়, সান্তালি ভাষা ও ব্যাকরণকে কেন্দ্র করে মিশনারিদের সাথে পি. ও. বোডিংয়ের মতের মিল ছিলনা। যারফলে তাকে দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়। ভারত ত্যাগ করার পূর্বে বিদায় মুহূর্তে তিনি কান্নাভেজা কণ্ঠে তার সান্তাল প্রীতি এবং সান্তালদের ত্যাগ করে চলে যাওয়ার দূঃখ সান্তালদের কাছে প্রকাশ করেন।
পরবর্তীতে তিনি তার ডেনিশ স্ত্রী ক্রিশ্টিন লারসেন কে নিয়ে ডেনমার্কের ওডেন্সে জীবন যাপন করেন। এখানেই তিনি ২৫ সেপ্টেম্বর ১৯৩৮ সালে পরলোকগমন করেন। তাকে ওডেন্সের কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।

.
এই মহান পন্ডিত ব্যক্তি সান্তালদের জীবনে শিক্ষার আলোর দেবদূত হয়ে এসেছিলেন। তিনি সান্তাল জাতির হৃদয়ে, চিরদিন বেঁচে থাকবেন দেবতার আসনে।

চিপকো আন্দোলন: গাছকে জড়িয়ে পরিবেশ বাঁচানোর এক লড়াই

চিপকো আন্দোলন: গাছকে জড়িয়ে পরিবেশ বাঁচানোর এক লড়াই

বাংলা সিনেমায় দেখা যায় ভিলেন মারতে আসলে নায়িকা নায়ককে বাঁচানোর জন্য জড়িয়ে ধরে রাখছে। শিরোনামে উল্লেখিত আন্দোলনের বৈশিষ্ট্য অনেকটাই যেন সেরকম; গাছ কাটা বন্ধের জন্য গাছকে জড়িয়ে ধরে আন্দোলনে নেমেছিলেন ভারতের উত্তরাখণ্ড রাজ্যের গ্রামবাসী।

বৈশ্বিক উষ্ণতা নিয়ে আন্দোলন এখন গোটা পৃথিবী জুড়েই হচ্ছে। তবে এর যাত্রা শুরু হয়েছিল অনেক আগে থেকেই। এমনই একটি পরিবেশবাদী আন্দোলন হলো চিপকো আন্দোলন। গাছ ও বন রক্ষার জন্য গাছকে জড়িয়ে ধরে যে অহিংস আন্দোলন হয়েছিলো সত্তরের দশকে তা-ই চিপকো আন্দোলন নামে পরিচিত।

হিন্দিতে চিপকো শব্দটির অর্থ আলিঙ্গন করা, আটকে থাকা। আর গাছকে আলিঙ্গন করার মধ্য দিয়ে এই আন্দোলনটি গড়ে উঠেছিলো বলে এর নাম চিপকো আন্দোলন। আজ থেকে ৪৭ বছর আগে ১৯৭৩ সালে স্বাধীন ভারতের উত্তরাখণ্ডে এই আন্দোলনটি শুরু হয়। কারখানা স্থাপনের জন্য তৎকালীন আমলারা ১০০ গাছ কাটতে উদ্যোগী হন, যার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় গ্রামের দুই যুবক সুন্দরলাল বহুগুনা ও চন্ডীপ্রসাদ ভট্ট। গাছকে জড়িয়ে ধরে তারা এর বিরোধিতা করেছিলেন। তাদের লক্ষ্য ছিল একটাই- যেভাবে হোক গাছ ও বন নিধন বন্ধ করে পরিবেশ রক্ষা করা।

পটভূমি:-

এ আন্দোলনের ভিত্তি রচিত হয় আরো দুই শতাব্দী আগেই। তখন ছিলো ১৭৩০ সাল। রাজস্থানের প্রত্যন্ত অঞ্চল খেজারিলি গ্রামে একটি রাজপ্রাসাদ গড়ার পরিকল্পনা করেছিলেন তৎকালীন মেওয়ারের রাজা। রাজার নাম ছিলো অভয় সিং। রাজার নেতৃত্বেই শুরু হয় গাছ কাটা কর্মসূচী। আর এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান তিন সন্তানের মা অমৃতা দেবী। পরবর্তীতে তার সাথে যোগ দেয় গ্রামের বিষ্ণই সম্প্রদায়ের লোকেরাও।তাদের উদ্দেশ্য একটাই- যে করেই হোক গ্রামের খেজরি গাছগুলোকে বাঁচাতে হবে। আর সেজন্য গাছের সাথে নিজেদের আটকে রেখে শুরু হয় এ আন্দোলনের প্রথম ধাপ। এভাবেই গাছকে জড়িয়ে ধরে রাখা অবস্থাতেই রাজার সৈন্যদের হাতে প্রাণ দিতে হয়েছিলো তাদের।

এরপর ১৯৬৩ সালে চীন-ভারত যুদ্ধের অবসানের পর ভারতের উত্তরাখন্ডে এই আন্দোলন আবার শুরু হয়। তখন উত্তরাঞ্চল, বিশেষত গ্রামীণ অঞ্চলগুলো, ব্যাপক উন্নটি করে। বিশেষ করে যুদ্ধের জন্য নির্মিত রাস্তাগুলো বিদেশি সংস্থাগুলোর বেশ নজর কাড়ছিল। যার ফলস্বরূপ সংস্থাগুলো চেয়েছিলো ঐ অঞ্চলের বনজ সম্পদ দখল করতে। সরকারের অনুমতি পেলে শুরু হয় বৃক্ষনিধন। অথচ জীবনধারণের জন্য বনজ সম্পদের দশ ভাগও ভোগ করতে দেয়া হতো না ঐ অঞ্চলের আদিবাসীদের। বাণিজ্যিক কারণে এভাবে বৃক্ষনিধনের ফলে কৃষির ফলন কমে যাচ্ছিল, মাটি ক্ষয় ও বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ নেমে এসেছিল ঐ অঞ্চলের। যার ফলাফল ছিলো গ্রামবাসীর জন্য হুমকিস্বরূপ।

পরবর্তী ইতিহাস:-

এই আন্দোলনটির সূত্রপাত হয় উত্তরাখণ্ডের চামেলি জেলায়, পরে তা দ্রুত ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। গান্ধীবাদী সমাজকর্মী চণ্ডী প্রসাদ ভট্ট ১৯৬৪ সালে স্থানীয় গ্রামবাসীর জন্য দশোলী গ্রাম্য স্বরাজ্য সংঘ ডিজিএসএম) নামে একটি ক্ষুদ্র সমবায় সংস্থা গড়ে তোলেন। ১৯৭৩ সালে উত্তর প্রদেশ থেকে এই আন্দোলন কঠোর রুপ ধারণ করে।

১৯৭৪ সালে সরকার কর্তৃক ২,০০০ গাছ কাটা হলে বিক্ষোভ শুরু হয় এবং সুন্দরলাল বহুগুনা গ্রামে গ্রামে গিয়ে নারী, পুরুষ, ছাত্রদের এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে আহ্বান জানান। ১৯৭২-৭৯ সালের মধ্যে দেড় শতাধিক গ্রাম চিপকো আন্দোলনের সাথে জড়িত ছিল। উত্তরাখণ্ডে ১২টি বড় ও ছোটখাট অনেক বিক্ষোভ হয়। ১৯৮০ সালে সুন্দরলাল বহুগুনাসহ আরও কয়েকজন নেতা ভাগীরথী নদীর তীরে বাঁধ নির্মাণের বিরোধিতা করেছিলেন, যা পরবর্তীতে ‘বীজ বাঁচাও আন্দোলন’ নামে পরিচিত। এটি আজও অব্যাহত রয়েছে।

জাতিসংঘের পরিবেশ সংক্রান্ত একটি কর্মসূচির এক প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে, চিপকো কর্মীরা আমলাতন্ত্রের হাত থেকে তাদের বনজ সম্পদ রক্ষা করতে পেরেছিলো। পরবর্তীতে ১৯৮৩ সালে কর্ণাটক রাজ্যে এপিকো আন্দোলনকেও (একইরকম পরিবেশবাদী আন্দোলন) অনুপ্রেরণা যুগিয়েছিলো।

চিপকো আন্দোলনের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো মহিলা গ্রামবাসীর ব্যাপক অংশগ্রহণ। এই অঞ্চলের কৃষির সাথে নারীরা যুক্ত থাকায় তারা এই বিক্ষোভে সরাসরি অংশগ্রহণ করেছিলো। এ আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিলেন গৌড়া দেবী, সুদেশা দেবী, বাচ্চনি দেবী, চন্ডী প্রসাদ ভট্ট, ধুম সিং নেজি, শমসের সিং, গোবিন্দ সিং রাওয়াত প্রমুখ। নারী-পুরুষ উভয় লিঙ্গের কর্মীই আন্দোলনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছেন।

আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ:-

প্রথম এই আন্দোলন যার হাত ধরে হয়েছিলো তিনি অমৃতা দেবী। উত্তর প্রদেশের এলাহাবাদে সরকার থেকে করাত কল মালিকদের ওপর গাছ কাটার আদেশ আসলে সেই অঞ্চলের আদিবাসী গৌরি দেবী তার সঙ্গীদের নিয়ে প্রতিবাদ করেন। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলেই এই আন্দোলনে শামিল হন।

এই আন্দোলনের একজন শীর্ষস্থানীয় নেতা সুন্দরবাল বহুগুণা। তিনি ছিলেন মহাত্মা গান্ধীর অহিংসা ও সত্যাগ্রহের একজন অনুসারী। ১৯৮১-৮৩ সালে তিনি চিপকো আন্দোলনের খবর পৌঁছে দিতে প্রায় ৫,০০০ কিলোমিটার পদযাত্রা করেছিলেন। ২০০৯ সালে পদ্মবিভূষণ পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছিলেন তিনি। ভারতের অসামরিক সর্বোচ্চ সম্মান পেয়েও তা সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করেন। এই বিষয়ে তার যুক্তি ছিল, যতদিন না ভারতে সবার মধ্যে পরিবেশ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি পাচ্ছে ততদিন তিনি এই পুরস্কার নিতে পারবেন না। তিনি ও তার স্ত্রী মিলে প্রথম এই পদক্ষেপ নেন এবং সারা দেশের কাছে এই বার্তা পৌঁছে দিতে মানুষের দ্বারে দ্বারে যান।

ফলাফল:-

উত্তরাঞ্চলের এই প্রতিবাদের খবর রাজধানীতে গিয়ে পৌঁছালে তৎকালীন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হেম্বতি নন্দন বহুগুনা একটি কমিটি গঠন করেন, যা শেষপর্যন্ত গ্রামবাসীর পক্ষে রায় দেয়। এরপর ইন্দিরা গান্ধী ক্ষমতায় আসলে তিনি ১৫ বছর হিমালয় অঞ্চলে গাছ কাটার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। হিমালয় প্রদেশ, কর্ণাটক, রাজস্থান, পশ্চিমঘাটেও পরে এ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। পরবর্তী পাঁচ বছরে উত্তর প্রদেশের বিভিন্ন জেলায় এবং এক দশকের মধ্যে হিমালয় জুড়ে সবুজের জন্য এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে।

নারীদের অবদান:-

ভারতের মতো পিতৃতান্ত্রিক একটি সমাজ ব্যবস্থা, যেখানে ঘরের বাইরের সব কাজ প্রধানত পুরুষরাই করে থাকে, সেখানে এই আন্দোলন অভাবনীয় অবদান রাখে নারীদের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে। নারীরাও যে কোনো অংশে কম নয় এবং প্রয়োজনে তারা সকল কাজই করতে পারে- সেটিই প্রমাণ করেছে চিপকো আন্দোলন। সর্বপ্রথম এই আন্দোলন শুরু হয় একজন নারীর, অমৃতা দেবীর, হাত ধরেই। শুধু তা-ই নয়।পরবর্তীতে এই নারীরা তাদের স্থানীয় বন রক্ষার্থে সমবায় সংগঠন গড়ে তোলেন। পাশাপাশি গাছ লাগানো কর্মসূচীও শুরু করেন।

সবুজকে বাঁচাতে গাছের সাথে নিজেকে আটকে রেখে যারা রক্ত ঝরিয়েছেন, তাদের কথা মনে রাখবে জনগণ। তাদের এই আত্মত্যাগ সাহস ও প্রেরণা যোগাবে ভবিষ্যৎ আন্দোলনকারীদের। ভারতীয় অঞ্চল ও বিশ্বজুড়ে পরিবেশ উন্নয়নের এই চিপকো আন্দোলন একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ, যা ভবিষ্যতের আন্দোলনের জন্য হয়ে থাকবে পাথেয়স্বরূপ।

সংগৃহীত।

বিশ্ব আদিবাসী দিবস : এক প্রহসন মাত্র

– এম. নেপোলিয়ন টুডু

আদিবাসীদের অস্তিত্ব রক্ষা ও অধিকার অর্জনের লক্ষ্যে ,  রাষ্ট্রসংঘ 9 আগস্ট কে বিশ্ব আদিবাসী দিবস হিসাবে ঘোষণা করেছিল। মূল লক্ষ্য ছিল শিক্ষা, স্বাস্থ্য সহ সর্বোপরি আদিবাসীদের সার্বিক উন্নয়ন। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আদিবাসী দিবস পালনের এত বছর পরেও আদিবাসীরা যে তিমিরে ছিল তারা আছে সেই তিমিরেই। আদিবাসীদের উপর শোষণ,বঞ্চনা লাগামহীনভাবে বেড়েই চলেছে। আজ আদিবাসীদের মাতৃভাষায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সংস্কৃতি গভীর সংকটে। তাদের মৌলিক অধিকার থেকে তারা শতহস্ত দূরে।

রাষ্ট্রসঙ্ঘের ঘোষণা অনুযায়ী পেরিয়ে গেছে আদিবাসী দশক। গতবছর পেরিয়ে গেছে আদিবাসী ভাষা বর্ষ। কিন্তু আজ কোথায় আদিবাসীদের অধিকার? ঠিক কোন জায়গায় দাঁড়িয়ে আদিবাসী গোষ্ঠীর ভাষাসমূহ? একটু খোঁজ নিলেই  পাওয়া যাবে, আদিবাসীদের ভাষা ও আদিবাসীদের অধিকারের এক গভীর সংকটময় অবস্থার কথা।

ইদানিং আদিবাসী দিবস নিয়ে একটু  বেশি করেই মত্ততা দেখা দিচ্ছে। কিছু কিছু জায়গায় সরকারিভাবেও আদিবাসী দিবস পালিত হচ্ছে। কিন্তু সেগুলো শুধু লোক দেখানো ছাড়া আর কিছু নয়! সরকারের নিজস্ব প্রচারের সীমাহীন ক্ষেত্রতে পরিণত হয়েছে। নাচ-গানের আয়োজন, দু-একটা সম্বর্ধনা সাথে ভাষণের ফুলঝুরি। এইভাবে  আদিবাসীদের সার্বিক উন্নয়ন কতটা সম্ভব, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।

আদিবাসীদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন বিষয়ে দূত পাঠানো হয়েছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সেই বিষয়টিকেই সর্বতোভাবে উপেক্ষা করা হচ্ছে। যেমন এ বৎসর উড়িষ্যা থেকে এক খারিয়া আদিবাসী গবেষক ছাত্রীকে পরিবেশ রক্ষার বিষয়ে বক্তব্য রাখার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হলো। অপরদিকে সেইসব এলাকাতেই আদিবাসীদের কাছ থেকে বন জঙ্গলের অধিকারকে সম্পূর্ণভাবে ছিন্ন করা হচ্ছে। যথেচ্ছভাবে গাছ কাটার মহাসমারোহ চলছে। নেই কোনো রূপ প্রশাসনিক ভ্রুক্ষেপ, প্রশাসনের বিন্দুমাত্র তৎপরতা । এতে করে পরিবেশের কি ক্ষতি হতে পারে কিংবা আদিবাসীদের অবস্থা কি হতে পারে, এই দায় যেন  তাদের চিন্তার বাইরে।

তাই এই করোনা পরিস্থিতিতে, পৃথিবী যখন  ভয়ঙ্কর সংকটময় অবস্থার মুখোমুখি ; তখন আদিবাসীদের নিয়ে এরকম ছেলেখেলা কেন? তাদের জাতিগত মৌলিক দর্শনের কথা চিন্তা করা হবে না কেন? তাদের প্রকৃতিনির্ভর জৈবিক সহাবস্থানকে ধ্বংস করা হবে কেন? এরকম হাজারো প্রশ্নের সম্মুখীন আমরা।

যদি সত্যি করেই আদিবাসীদের অস্তিত্বকে, পরিচয়কে টিকিয়ে  রাখার জন্য এই চিন্তা ভাবনা, তাহলে আজ তাদের এই অবস্থা কেন? রাষ্ট্রসঙ্ঘের পক্ষ থেকে আদিবাসীদের জন্য আর্থিক ঘোষণা নেই কেন? সারা বছরের কর্মসূচির ছিটেফোটাও দেখা যায় না কেন? শুধু কি একটা দিন পালন করলেই আদিবাসীদের সব সমস্যার সমাধান হবে? নাকি এর পিছনেও লুকিয়ে আছে কিছু গুঁড় রহস্য ?

আজ এই অবস্থায় দাঁড়িয়ে অবশ্যই ভাববার সময় এসেছে। কিছু বলবার সময় এসেছে, হাতে কলম নিয়ে লিখার সময় এসেছে। না হলে বছরের পর বছর আদিবাসী দিবস পালন করে গেলেও আদতে কোন উন্নয়ন  ধরা দেবে না। আদিবাসীরা শুধু নাচবে গাইবে, তাদের নাচ-গান ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় প্রদর্শিত হবে। কিন্তু লাভের লাভ তাদের কিছুই হবে না।  

তাই এই পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, বিশ্ব আদিবাসী দিবস প্রহসন ছাড়া আর কিছু নয়।এই ছলনা যেন অবিলম্বে বন্ধ হয়।পৃথিবীর প্রতিটি  রাষ্ট্রের প্রত্যেক রাষ্ট্রপ্রধানদের একটি কথা অবশ্যই মনে রাখতে হবে ____
“যারে তুমি নিচে ফেল সে তোমারে বাঁধিবে যে নীচে,
পশ্চাতে রেখেছ যারে সে তোমারে পশ্চাতে টানিছে ;
অজ্ঞানের অন্ধকারে
আড়ালে ঢাকিছ যারে ;
তোমার মঙ্গল ঢাকি গড়িছে সে ঘোর ব্যবধান
অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান” ।

                       ______*****______

Rating: 1 out of 5.

বীরহড় কন্যাদের গান ও অস্তিত্বের জন্য সংগ্রাম এর কথা

লিখেছেন ডঃ জলধর কর্মকার

আমাদের ভারতবর্ষে যে 75 টি আদিম জনজাতির মানুষজন আছেন তাদের মধ্যে তিনটি আছেন আমাদের পশ্চিমবাংলায় তারা হলেন বিরহড়, লোধা শবর এবং জলপাইগুড়ির টোটো। পুরুলিয়া জেলার আদিমতম জনজাতিরা অবলুপ্তপ্রায়। পুরুলিয়া জেলায় এদের সংখ্যা…।

এদের অবস্থান এখন অযোধ্যার পাদদেশে এবং বলরামপুর এবং এবং ঝালদা এক নম্বর ব্লকে এরা সম্পূর্ণরূপে অরণ্যচারী যাযাবর জাতি এদের মধ্যে একমাত্র জীবন জীবিকা ছিল বনের কেন্দ, পিয়াল ইত্যাদি ফলমূল, কন্দ জোগাড় করে খাওয়া, নদীর মাছ ধরা, লতা থেকে দড়ি তৈরি করা এবং পশু শিকার করা ছিল এদের জীবন জীবিকা। চাষবাস এরা একেবারেই জানতো না বল লেই চলে, এখন যদিও কিছু কিছু চাষবাস করছে।

ইদানিং এদের মধ্যে লেখাপড়ার একটা চল দেখা যাচ্ছে এবং প্রথম বীরকন্যা জানকী শিকারি যিনি এই বছর ধস্কা পন্ডিত রঘুনাথ মুরমু আবাসিক বিদ্যালয় থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করলেন এবং মাধ্যমিক পাস করলেন জবা শিকারি। এছাড়া এই বিরহড় সন্তানদের মধ্যে কাঞ্চন শিকারি ও সিতারাম শিকারি কয়েকবছর আগে তারা উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেছেন শুশুনিয়া একলব্য মডেল হাইস্কুল থেকে এবং আরো কয়েকজন পড়াশোনা করছেন। এই সমস্ত এই সমস্ত বিরহড়রা অবলুপ্তপ্রায় জাতি এবং এদের ভাষা-সংস্কৃতি অতিদ্রুত সাঁওতালি বা মুন্ডারি দের গর্ভে বিলীন হতে চলেছে। এই বিরহড়রা আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী জাতি তাদেরকে বাঁচিয়ে রাখাটা আমাদের কর্তব্যের মধ্যে পড়ে।

বিরহড় কন্যারা যে গানটি গেয়েছেন সেটি হল, আলে দলে বিরহড়………

বিশ্ব আদিবাসী দিবস ও বর্তমান আদিবাসী সমাজ

আজ ৯ই আগস্ট বিশ্ব আদিবাসী দিবস। বিশ্বের আদিবাসী জনগণের অধিকার সংরক্ষণ এবং সচেতনতা বাড়াতে প্রতি বছর ৯ই আগস্ট বিশ্ব আদিবাসীদের আন্তর্জাতিক দিবস পালন করা হয়। এই ইভেন্টটি পরিবেশ সংরক্ষণের মতো বিশ্বের সমস্যাগুলি উন্নত করতে আদিবাসীদের কৃতিত্ব ও অবদানকে স্বীকৃতি দেয়। ১৯৯৪ সালের ডিসেম্বর মাসে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশন কর্তৃক এটি প্রথম উচ্চারিত হয়েছিল। সারা বিশ্বের আদিবাসীরা আজকের দিনটা খুব উৎসাহের সঙ্গে পালন করে আসছে। আদিবাসী বলতে কাদের বোঝায় বা আদিবাসী বলতে আমরা কাদের বলব? আদিবাসী কারা এটা এক কথায় প্রকাশ করা বা বলা সম্ভব নয় জাতিসংঘ একটা কার্যকরী সংজ্ঞা বলেছিলেন তা হল, ”আদিবাসী জনগোষ্ঠী জাতি এবং জাতি গুলি হল,যেগুলি প্রাক আগ্রাসন এবং প্রাক-ঔপনিবেশিক সমাজগুলোর একটি ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা যা তাদের অঞ্চলগুলিতে বিকশিত হয়েছিল,সে অঞ্চল গুলিতে তাদের কিছু অংশে বিরাজমান সমাজের অন্যান্য খাত থেকে নিজেকে আলাদা মনে করে। তারা বর্তমানে সমাজের অপ্রভাবসালী খাত গঠন করে এবং তাদের নিজস্ব সংস্কৃতির নিদর্শন অনুসারে জনগন হিসেবে তাদের অবিচ্ছিন্ন অস্তিত্বের ভিত্তি হিসেবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে তাদের পূর্বপুরুষের অঞ্চল এবং তাদের জাতিগত পরিচয় সংরক্ষণ, বিকাশ এবং সংক্রমণে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা,সামাজিক প্রতিষ্ঠান এবং আইনি ব্যবস্থার মাধ্যমে।”

অর্থাৎ বলা চলে উন্নত সভ্যতার গঠন হওয়ার পূর্বে যে সমস্ত জাতি বসবাস করত যাদের নিজস্ব ভাষা, ধর্ম, সংস্কৃতি অন্যদের চেয়ে অনেক আলাদা ও স্বতন্ত্র, যারা নিজের সমাজের অস্তিত্ব রক্ষায় দৃঢ় প্রতিজ্ঞ এবং উন্নয়নশীল সমাজের থেকে অনেক দূরে, জল জঙ্গল,পাহাড়ে যাদের বাস তাদের কেই আমরা আদিবাসী বলতে পারি। এই আদিবাসীরা হলো দেশের একমাত্র আদিম অধিবাসী। আজকের আধুনিক সমাজের জনক সেই আদিবাসী,যাদের নিজস্ব অর্থায়নে পরিচালিত হয় নিজের সংস্কৃতি,ধর্ম,পূজা পার্বণ। বন জঙ্গল যাদের প্রাণ, এই প্রকৃতি তাদের দেব স্থান, যারা হলেন প্রকৃতির পূজারী তারাই হলো আদিবাসী। এই আদিবাসীরা যুগ যুগ ধরে নানা রকম ভাবে শোষিত, বঞ্চিত,নিপীড়িত এক জাতি। যাদের কে বার বার করে তাদের বাসস্থান পাল্টাতে হয়েছে অত্যাচারী শাসকের জন্য। এই আদিবাসীরা আজকের দিনও শোষিত, বঞ্চিত, নিপীড়িত এক জাতি। পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই আদিবাসীদের বসবাস দেখাযায় কমবেশী।

আমাদের ভারত বর্ষে ১০ মিলিয়নের চেয়েও বেশি আদিবাসী বসবাস করছেন। এই আদিবাসীদের মধ্যে আবার অনেক জাতি আছে যাদের ভাষা, ধর্ম, সংস্কৃতি ভিন্ন ভিন্ন । সাঁওতাল জাতি তার মধ্যে এক উন্নত আদিবাসীদের মধ্যে একটা জাতি। যাদের মাতৃ ভাষায় শিক্ষালাভ এর সুযোগ আছে। আদিবাসী সম্প্রদায় গুলি ইতিমধ্যে প্রচুর বাধার সম্মুখীন হয়েছে এবং দুর্ভাগ্যজনক বর্তমান বাস্তবতার ই হচ্ছে যে COVID-19 এর প্রভাব এখন এ বাধাগুলোকে আরও কঠিন করে তুলেছে। আদিবাসী সম্প্রদায়় গুলো ইতিমধ্যে স্বাস্থ্যসেবা গুলিতে সঠিক পরিষেবা থেকে বঞ্চিত,রোগের উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধির হার, প্রয়োজনীয় পরিষেবা গুলোর অভাব স্যানিটেশন এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা যেমন পরিষ্কার জল জীবাণুনাশক ইত্যাদি। এমনকি আদিবাসীরা যখন স্বাস্থ্যপরিসেবা পেয়ে থাকে তখনো তাদের বিভিন্ন অপমানজন ও বৈষম্যের শিকার হতে হয়। মূল বিষয় হলো আদিবাসীদের নির্দিষ্টট পরিস্থিতির জন্য উপযুক্ত হিসাবে আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় আদিবাসী ভাষায় পরিষেবা এবং সুযোগ-সুবিধা সরবরাহ নিশ্চিত করা। এছাড়াও শিক্ষাক্ষেত্রে আদিবাসীদের সমস্ত রকম সুযোগ-সুবিধা দেওয়া যাতে তারা নিখরচায় শিক্ষা লাভ করে তাদের জাতিকে উন্নয়নের মূল স্রোত এ নিয়ে আসতে পারে তার জন্য সকারের সদিচ্ছা থাকতে হবে।

এছাড়াও আদিবাসী যাতে মাতৃভাষায় পড়াশোনা করতে পারে তার ব্যবস্থাাা করা প্রয়োজন। আদিবাসীরা প্রায় সকলেই অসংগঠিত ক্ষেত্রে কাজ করে তাদের সংসার চালান। অনেক ক্ষেত্রে মহিলারা সংসারেেের হাল ধরেন। বন থেকেে শুকনো কাঠ পাতা আরোহন করে রোজগার করেন। ভারতবর্ষে অরণ্যযবাসী আদিবাসীদের অরণ্যের অধিকার আইন ২০০৬ কে সংশোধন করার মাধ্যমে আদিবাসীদের জীবনযাত্রাকে এক চরম সংকটের মুখে ঠেেলে দেওয়া হয়েছে। সাঁওতাল পরগনা টেনান্সি অ্যাক্ট ছোটনাগপুর টেনান্সি অ্যাক্ট বাতিল করার মাধ্যমে সাঁওতাল তথা আদিবাসীদের জমির উপর সরকার থাবা বসাতে চলেছে। বড়় বড় শিল্পপতিদের হাতে অরণ্যের অধিকার তুলে দিয়ে অরণ্য ধ্বংস করার একটা চক্রান্ত চলছে। সরকার আদিবাসীদের সংগঠিত ক্ষেত্রে কাজ দেওয়া ও অরণ্যের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে আদিবাসীদের প্রকৃত উন্নয়ন করার জন্য সচেষ্ট হতেে হবে। ভারতবর্ষে বিভিন্ন ভাষাভাষী আদিবাসী মানুষজন থাকলো সবাই কিন্তুুুু তাদের মাতৃভাষায় পড়াশোনা করার সুযোগ পায় না।

2003 সালের 22 শে ডিসেম্বর ভারতবর্ষের সংবিধানের অষ্টম তফসিলেে সাঁওতালি ভাষাা অষ্টম তফসিলে অন্তর্ভুক্তি হওয়ার দীর্ঘদিন পর সাঁওতালি ভাষায়় পড়াশোনা চালু হয়েছে। বহু বঞ্চনার মধ্যে আজ এগিয়ে চলেছ। এই বার প্রথম উচ্চমাধ্যমিক পাশ করার পর কলেজে ভর্তি হওয়ার জন্য এখনো পর্যন্ত শুধুমাত্র একটি কলেজে দুটি বিষয়ের উপর অনার্স কোর্সে পড়ার জন্য অনুমোদন পেয়েছি। কিন্তুুু দুর্ভাগ্যের বিষয়় যখন অন্যান্য মিডিয়ামেের ছাত্র ছাত্রীরা আগামীকাল থেকে কলেজে ভর্তি হওয়ার জন্য অনলাইনে ফরম ফিলাপ শুরু করবে কিন্তু সাঁওতালি মিডিয়াম ছাত্র-ছাত্রীদের এখনো পর্যন্ত কলেজের নাম ও জানানো হলো না। জানিনা এভাবেে কি সরকার ভারত বর্ষ থেকে আদিবাসীদের চিরতরে মুছেে ফেলতে চায়? কিন্তু না, সরকার শত চেষ্টা করেও কিন্তুুু আদিবাসীদের অস্তিত্ব মুছে ফেলতে পারবে না। এই আদিবাসীরাই একদিন ইংরেজদের গোলাবারুদের সামনে ভারতবর্ষকে স্বাধীন করার জন্য বুক চিতিয়ে আন্দোলন করেছিলেন। একথা গর্বব করে বলতে বলতেে পারি ১৮৫৫ সালে হুল বিদ্রোহ সংগঠিত না করলে ভারতবর্ষের অন্যান্য জাতি ইংরেজদের হাত থেকে স্বাধীনতা পাওয়ার জন্য আন্দোলনের কথা ভাবতেও পারতেন না। সেই আদিবাসীদেের অস্তিত্বকে অস্বীকার করা একটা ঐতিহাসিক ভুল হবেই এবং তার জবাব কড়া হাতেই করা হবে। (সংক্ষিপ্ত)

শতবর্ষের দোরগোড়ায় “অলচিকি” লিপি

কলমে:- রিমিল

“অকারণে বৃথাই কেন করো বারণ, সময় চলে আপন খেয়ালে, সময়ের সাথে অগ্রগতি মোদের চলনে।”

দেখতে দেখতে আমরা আজ 95 বৎসরে পা রাখলাম আর পাঁচ বছর পরে পূর্ণ হবে শতবর্ষের। আমরা সেই মহান ঐতিহাসিক বর্ষের দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছি। আর পাঁচ বছর পরেই আসবে সেই মহান বর্ষ অর্থাৎ 2025 সালে পূরণ হবে সাঁওতালি ভাষার জন্য প্রথম লিখিত বর্ণমালা অলচিকি হরফ এর। একটা সময় ছিল যখন সাঁওতালি ভাষাতে পঠন পাঠন করার জন্য কোন সুযোগ-সুবিধা বা সাঁওতালি ভাষায় রচিত কোন পাঠ্যপুস্তক ছিল না। নিজের মাতৃভাষায় লেখাপড়া করার যে একটা সুবিধা সেটা বুঝতে পেরেছিলেন পন্ডিত রঘুনাথ মুরমু মহাশয়। অন্য কোন লিপিতে সাঁওতালি ভাষা লিখিত আকারে সঠিকভাবে প্রকাশ করা যায় না তা বলাই বাহুল্য। সাঁওতালি ভাষা লিখিত আকারে প্রকাশ করার জন্য একটা স্বতন্ত্র লিপির প্রয়োজন ছিল। এছাড়াও এই পৃথিবীতে সাঁওতালি ভাষাকে টিকিয়ে রাখতে গেলে নিজস্ব মাতৃভাষার মত নিজস্ব একটা দরকার ছিল । এই সমস্ত কিছু সুবিধার্থে এবং মাতৃভাষায় পড়াশোনা করার জন্যই পন্ডিত রঘুনাথ মুর্মু 1925 সালে “অলচিকির” সৃষ্টি করেছিলেন। আজ আমরা উনার সৃষ্টি করা লিপির মাধ্যমে সাঁওতালি ভাষায় পাঠ্যপুস্তক রচনা থেকে সাহিত্য চর্চা ইত্যাদি করে থাকি। এই “অলচিকি” হরফকে জনসাধারণের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য নিজ হাতে ছাপাখানা তৈরি করে ও বই ছেপে তা প্রসারে জোর দিয়েছিলেন পন্ডিত রঘুনাথ মুরমু মহাশয়। এই “অলচিকি” লিপিতে মুদ্রিত প্রথম বই হল “বিদু চাঁদান” 1942 সালে বাংলা “অলচিকি” দুইটি হরফে ছাপা হয়েছিল ,উক্ত বছরেই “অল চেমেদ”ও “অল উপরুম” বই দুটি লেখেন পন্ডিত রঘুনাথ মুরমু।

আজকে অনেক বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে এগিয়ে চলেছে স্বমহিমায় “অলচিকি “লিপি। এই “অলচিকি” লিপি যে বিজ্ঞানসম্মত তা একবাক্যে সবাই মেনে নেন কিন্তু “সুন্দর সে যতই হোক বিশ্রী বলার লোক তো থাকবেই” সেইরুপ, অনেকেই “অলচিকি” লিপির গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছিলেন। উনারা “রোমান” হরফে সাঁওতালি তে লেখাপড়া চালু করার জন্য একটা প্রচেষ্টা করেছিলেন এবং তাতে উনারা কিছুটা সফলও হয়েছিলেন। এখনো এই “রোমান” হরফে সাঁওতালি ভাষা চর্চার করার একটা প্রচেষ্টা আছে কিন্তু “অলচিকি” লিপিতেই যে একমাত্র সাঁওতালি ভাষা লিখিত ভাবে প্রকাশ করা যায় তা অন্য কোন ভাষার লিপিতে সম্পূর্ণ রূপে প্রকাশ করা অসম্ভব। সাঁওতালি ভাষার নিজস্ব লিপি “অলচিকি”র শতবর্ষ উদযাপনের জন্য বা স্বাগত জানানোর জন্য সাঁওতালি ভাষা দরদী মানুষজনের মধ্যে অন্য আবেগ, অনুভূতির ঢেউ খেলে যাচ্ছে। শতবর্ষকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য নানারকম কর্মসূচির বাস্তবায়নের জন্য এখন থেকে প্রস্তুতি চোখে পড়ার মতো।

2003 সালের 22 শে ডিসেম্বর ভারতের” অষ্টম তফসিলে” সাঁওতালি ভাষা অন্তর্ভুক্তি হওয়ার পর 2005 সাল থেকে “সাহিত্য একাডেমী” নিউ দিল্লি ,সাঁওতালি ভাষায় রচিত সাহিত্যকর্মের জন্য পুরস্কার চালু করেছে। এই পুরস্কারের জন্য সাঁওতালি সাহিত্যচর্চা দ্বিগুণ গতিবেগ পেয়েছে একথা কিন্তু মানতেই হবে। নিত্যনতুন লেখক ও কবি এর আবির্ভাব তারই ইঙ্গিত বহন করছে। এখনতো সাঁওতালি সাহিত্য চর্চা করার জন্য লেখক, কবিগণ বই, খাতা, ডায়েরি তুলে রেখে “ফেসবুক” সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে নিজের লেখনশৈলী তুলে ধরতে বেশি মাত্রায় উৎসুক থাকেন। এই ফেসবুক সোশ্যাল মিডিয়া থেকে নিত্যনতুন অনেক লেখক ও কবির সন্ধান পাওয়া যায়। যারা কিনা বই ছাপা করার থেকে ফেসবুক কেই বই হিসাবে ব্যবহার করতে পছন্দ করেন । যারা অন্য লেখকের ছাপা বই পড়ার জন্য কোন সময় পান না, উনারাই আবার ফেসবুকে ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দেন। তবু বলব এই ফেসবুক মিডিয়ার মাধ্যমে সাঁওতালি সাহিত্য চর্চা খুব জোরদার ভাবেই চলছে। তার সাথে সমান তালে চলছে সাঁওতালি মাধ্যমের পঠন-পাঠন ও ” মিশন অলচিকি 2025″- এর কর্মযজ্ঞ। এই মিশনের এক এবং অদ্বিতীয় উদ্দেশ্য হল সাঁওতালি ভাষার প্রসার ও সাঁওতালি ভাষা শিক্ষার ক্ষেত্রে অলচিকি লিপিতে 100% স্বাক্ষর করে তোলা। এই উদ্দেশ্যে বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ায় জোরদার প্রচার ও “অল চিকি” তে পাঠদানের উপর জোর দেওয়া হচ্ছে যাতে 2025 সালের মধ্যে সাঁওতালি ভাষার ক্ষেত্রে অলচিকি লিপির ব্যবহার 100% নিশ্চিত করা যায়। এটা একটা খুবই প্রশংসনীয় পদক্ষেপ এতে কোন সন্দেহ নেই।

কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে “মিশন অল চিকি 2025” অধরাই থেকে যাবে ও তাহার পরিপূর্ণ স্বাদ পেতে আমাদের হয়তো আরো অনেক বছর অপেক্ষা করতে হবে। কেননা এই অল চিকি লিপিতে সাঁওতালি ভাষা চর্চা ও প্রচারে যাদের ভূমিকা অগ্রগণ্য বলে মনে করা হয় সেই সমস্ত লেখক, কবি ,গীতিকারগণ সাঁওতালি ভাষায় সাহিত্য চর্চার জন্য “অলচিকি” নয় অন্য কোন দ্বিতীয় ভাষার অবলম্বন করছেন যেমন উড়িষ্যাতে “ওড়িয়া” আসামে “অসমীয়া” পশ্চিমবঙ্গে “বাংলা” ঝাড়খন্ড ও বিহারে “দেবনাগরী” লিপিতে সাহিত্য চর্চা করতে বেশি অভ্যস্ত ও ভালো মনে করেন বলেই মনে হয়। এছাড়াও ফেসবুক, হোয়াটঅ্যাপস ছাড়াও অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়ায় সাঁওতালি ভাষায় লেখার জন্য অলচিকি লিপির ব্যবহার করা গেলেও তা কিন্তু অনেকেই যত্নসহকারে এড়িয়ে যান অদ্বিতীয় ভাষাতেই লেখালেখি বা কোন কিছুর উপরে পোস্ট করতে পছন্দ করেন। এর থেকেও আরও একটা উদ্বেগের বিষয় হলো যে সমস্ত সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীগণ আছেন উনাদের মধ্যে যারা অলচিকি লিপি দরদী মানুষজন আছেন উনারা নিজের লেখা গুলো অলচিকি লিপিতে পোস্ট করে থাকেন। এই লেখাগুলো যতই সুন্দর ও তথ্য সমৃদ্ধ হোক না কেন সে সমস্ত পোস্টগুলোকে সন্তর্পনে এড়িয়ে চলতেই সবাই এখন অভ্যস্ত এবং দিনের শেষে দেখা যায় একটা লাইক বা কমেন্ট ও জমা পড়ে না কিন্তু উক্ত লেখাটি আবার দ্বিতীয় কোন হরফে লেখা হলে লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার করার বন্যা বয়ে যায়। এর থেকেই স্পষ্ট বোঝা যায় মুখে যতই আমরা বলি না কেন সাঁওতালি ভাষা মোদের মাতৃভাষা, অলচিকি লিপি মোদের গর্ব কিন্তু আমরা তার ব্যবহার 5% করি কিনা সন্দেহ আছে।

“মাতৃভাষা মাতৃদুগ্ধ সমান”- এই কথাটা অন্য ভাষার ক্ষেত্রে যথার্থ মনে হলেও সাঁওতালি ভাষার ক্ষেত্রে এই একবিংশ শতাব্দীতে এসে মনে হয়না যথার্থ হবে। তাইতো এখনও সেরকম ভাবে কোনো পত্রপত্রিকা অলচিকি লিপিতে ছাপা হয় না। যে কয়েকটি ছাপা হয় তা উক্ত পত্রিকার সম্পাদকের সাঁওতালি ভাষা প্রীতির জন্য সম্ভবপর হচ্ছে। এছাড়াও এই একবিংশ শতাব্দীতে এসে সাঁওতালি ভাষা জানা মানুষ জন প্রযুক্তিতে এগিয়ে চলেছে তবুও এখনো সেরকম একটা সাঁওতালি ভাষায় ওয়েবসাইট দেখতে পাওয়া যায় না। হাতেগোনা দুটি বা তিনটি ওয়েবসাইট বর্তমানে দেখতে পাওয়া যায় ,যাতে প্রতিনিয়ত নিত্যনতুন খবর ও নতুন নতুন লেখকের সাহিত্য চর্চা দেখতে পাওয়া যায়। বহুল পরিচিত ও স্বনামধন্য যে সমস্ত পত্রপত্রিকা ও ওয়েবসাইট সাঁওতালি সাহিত্য চর্চার জন্য আছে তাও কিন্তু অন্য দ্বিতীয় লিপির মাধ্যমে সাঁওতালি ভাষা প্রকাশ করা হয়।

পরিশেষে এটাই বলব এখনকার ছাত্রছাত্রীরা যারা সাঁওতালি মাধ্যমে পড়াশোনা করছে শুধুমাত্র তারাই অলচিকি লিপিতে পাঠ্যবই পড়াশোনা করছে এবং তারাই হল একমাত্র সাঁওতালি ভাষা দরদী। তারা এক অনিশিত ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে চলেছে, কুর্নিশ তাদের জানাতেই হয় এবং তার সাথে তাদের প্রিয় অভিভাবক অভিভাবিকাদের । এই অলচিকি লিপির শতবর্ষ কেমন হবে বা সাঁওতালি ভাষাকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরার জন্য আমাদের নিঃস্বার্থভাবে এগিয়ে আসা দরকার। সে সমস্ত সম্পাদক মহাশয় পত্রপত্রিকা বা ওয়েবসাইটে যারা প্রতিনিয়ত অলচিকি লিপির প্রচারের জন্য সচেষ্ট তাদের পাশে আমাদের থাকা একান্তই উচিত।

সাঁওতালি মাধ্যমের শিক্ষা আজ কোন পথে!!!

বিরেন্দ্র নাথ কিস্কু

অতি আনন্দের সহিত এবছর সাঁওতালি মাধ্যমের ইতিহাসে সংযোজিত হলো নতুন মুকুট। এ বছর অর্থাৎ ২০২০ সাল সাঁওতালি মাধ্যমের শিক্ষার ইতিহাস চিরদিন স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে এই গৌরবময় অধ্যায়। তবুও সাঁওতালি ভাষা প্রিয়, সাঁওতালি ভাষা দরদী মানুষজনের মনে কোথায় যেন একটা ‘কিন্তু’ রয়ে যাচ্ছে। সেই ‘কিন্তু এর উত্তর খোঁজার কারনে আজকের এই কলম।

বিগত ১২ বছর ধরে প্রচুর বাধা বিপত্তির মধ্যেও সাঁওতালি মাধ্যমের পথ চলা বন্ধ হয়ে যায়নি, মাঝ পথে ছাত্র ছাত্রীদের কিছুটা অভাব সেই অন্ধকারের প্রতিচ্ছবি কিন্তু সাঁওতালি দরদী মানুষের মনে ফুলকির মতো ঝলক দেখা দিয়েছিল তাও ধীরে ধীরে কাটিয়ে উঠে ২০১৮ সালে পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ থেকে মাধ্যমিক ও ২০২০ উচ্চ মাধ্যমিক সংসদ থেকে অর্থাৎ এবছর উচ্চ মাধ্যমিক খুব ভালো মেধার পরিচয় দিয়ে পাশ করে গেছে। প্রথম থেকে যেমন পাঠ্যপুস্তক ও শিক্ষক শিক্ষিকার অভাব ছিল, বর্তমানেও তাহার কোনরূপ পরিবর্তন হয়নি। এই অবস্থা তো ছাত্র-ছাত্রীদের না যায় প্রমাণ করে দেয় পাঠ্যপুস্তক যতই থাকুক ভুলে ভরা, না থাকুক সমস্ত বিষয়ের শিক্ষক শিক্ষিকা শিক্ষা আমাদের মৌলিক অধিকার তা আমরা অর্জন করবোই। পদ্ম মসজিদ থাকার কারণে আজ উচ্চমাধ্যমিকে সমস্ত বিষয়ের পাঠ্যপুস্তক না থাকার কারণটা ম্লান করে দিয়ে এগিয়ে চলেছে এবং ভবিষ্যতে এভাবেই এগিয়ে যাবে এই আশা করা যায়। ভাবি একবার ভাবুনতো ওই সকল ছাত্র-ছাত্রীদের কথা যারা উচ্চমাধ্যমিকে পাঠ্যপুস্তক না পেয়েও উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে গেল কিভাবে?? নিশ্চয়ই প্রশ্ন আপনার মাথায় আসছে এবং উত্তরটা খুব সহজে পেয়ে গেলেন, কেননা কোন বাংলা মাধ্যমের পাঠ্যপুস্তক পড়ে বা ইংরেজি মাধ্যমের পাঠ্যপুস্তুক পড়াশোনা করে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে গেল এবং সেই সাথে বাংলা মাধ্যমে প্রাইভেট টিউটরের কাছে পড়াশোনা করেছিল। এবিষয়ে কারো সন্দেহ থাকার কথা নয়। এ পর্যন্ত পড়ে আপনার মনে হতে পারে তাতে কি হয়েছে??? ছাত্র-ছাত্রীরা তো সাঁওতালি মাধ্যমেই পরীক্ষায় পাশ করেছে। হ্যাঁ সাঁওতালি মাধ্যমে পাস করেছে। এরপর হচ্ছে সেই কিন্তু র পালা, কেননা সাঁওতালি মাধ্যমে ছাত্র-ছাত্রীরা সমস্ত বিষয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকা ছাড়াই ও সর্বোপরি পাঠ্যপুস্তক ছাড়াই যেভাবে পাশ করে গেল আর কলেজের ক্ষেত্রেও একইভাবে পাস করবে এই ভাবনাটা কি ঠিক? যেখানে পশ্চিমবঙ্গ সরকার উচ্চ মাধ্যমিকের পাঠ্যপুস্তক ছাত্র-ছাত্রীদের হাতে তুলে দিতে পারলোনা, শিক্ষক-শিক্ষিকা বিষয়ভিত্তিক দিতে পারল না, এই অবস্থায় কলেজের পাঠ্য পুস্তক ,অধ্যাপক অধ্যাপিকার কাছে ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনা করার আশা একেবারে নেই বললেই চলে। কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের ভর্তি পড়াশোনা সুনিশ্চিত করার জন্য আদিবাসী সংগঠন আ্যসেকা মাননীয় শিক্ষা মন্ত্রী কে আবেদন জানিয়েছেন অতি শীঘ্র সাঁওতালি মাধ্যমের জন্য কলেজের ব্যবস্থা করার আর্জি জানিয়েছেন। এটা একটা খুবই প্রশংসনীয় পদক্ষেপ এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। মাননীয় আ্যসেকার পদাধিকারী ও সদস্যগন এটাও ভালো করে জানেন যে উনারা যে সমস্ত কলেজে সাঁওতালি মাধ্যমের ছাত্র ছাত্রীদের ভর্তি করার জন্য সকারের কাছে আবেদন জানিয়েছেন সেই সমস্ত কলেজে সাঁওতালি বিষয় অনার্স ও পাশ কোর্স এ পড়াশুনা চলছে আগে থেকেই তাই সেখানে সাঁওতালি বিষয়ের অধ্যাপক পাওয়া যাবে কিন্তু বাকি বিষয়ের ক্ষেত্রে কি অধ্যাপক পাওয়া যাবে? সাঁওতালি মাধ্যমের ছাত্র ছাত্রীরা তো আর সাঁওতালি বিষয় নিয়ে সবাই পড়বে তাতো নয়, যার যে বিষয়ে পড়ার আগ্রহ ও সেই বিষয়ে পড়তে পারে। তাহলে পাঠ্যপুস্তক ছাড়াই ও অধ্যাপক ছাড়াই তারা কিভাবে পড়াশুনা করবে? এখানেও সেই একটাই উপায় যে উপায়ে তারা উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেছে তাহলো বাংলা মাধ্যমের বা ইংরেজি মাধ্যমের পাঠ্যপুস্তক পড়ে ও প্রাইভেট টিউটরের কাছে সাহায্য নেওয়া। এখানে আমার একটা বিষয় বলার আছে তা হল মুক্ত কলেজগুলিতে বিজ্ঞান বিষয় অনার্স বা পাস কোর্সে পড়ানো হয় না তাহলে বিজ্ঞান বিভাগে যে সমস্ত ছাত্র-ছাত্রীরা ভর্তি হতে ইচ্ছুক বা ভর্তি হবে তারা কোন কলেজে ভর্তি হবে? এ বিষয়টিকে আরো ভালোকরে ভাবার প্রয়োজন ছিল। এছাড়াও সাঁওতালি মাধ্যমের ছাত্রছাত্রীরা উক্ত কলেজের পাশাপাশি প্রাইভেট টিউটরের উপর ভরসা করে পড়াশোনা চালিয়ে যাবে তাও তো কলেজগুলির কাছের শহর বাজারগুলিতে পাওয়া নাও যেতে পারে এ অবস্থায় তাদের পড়াশোনার জন্য জেলা শহরগুলোতে যেতে হবে প্রাইভেট টিউটরের জন্য কিন্তু যারা এবছর উচ্চ মাধ্যমিক পাস করল তাদের শতকরা 99 জনের পারিবারিক অবস্থা খুবই সংকটজনক তাই তাদের পক্ষে গাঁটের কড়ি খরচ করে দূরে বাঁকুড়া ঝাড়গ্রাম মেদিনীপুর শহরে প্রাইভেট টিউটরের জন্য না যেতে পেরে মাঝপথে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য হতে পারে। এছাড়াও আরেকটা বিষয় হলো কেন্দ্রীয় সরকারের যে সমস্ত হোস্টেল আছে সে সমস্ত হোস্টেলের কাছাকাছি ছাত্রীদের কলেজের ব্যবস্থা করা গেলে তা খুব ভালো হতো।যেমন বাঁকুড়া জেলার সারদামণি ওমেন্স কলেজ , পুরুলিয়ার নিস্তারিণী কলেজ, ঝাড়গ্রাম রাজ কলেজ ইত্যাদি। যেখানে বাংলা মাধ্যমের ছাত্রছাত্রীরা ভালো কলেজে পড়াশোনা করার সুযোগ পায় সেখানে সাঁওতালি মাধ্যমের ছাত্র-ছাত্রীরা পড়াশোনার সুযোগ না পেলে তাদের মধ্যে একটা মানসিক আঘাত আসবে এর ফলে তারা পড়াশোনা করার আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারে কেননা সাঁওতালি মাধ্যমে যারা রাজ্যে প্রথম 10 জনের মধ্যে স্থান নিয়েছে তাদের ও ভালো কলেজে পড়ার বা শহরের কোন কলেজে পড়ার একটা আশা থাকে। আমরা যদি সরকারের কাছে উক্ত কলেজ গুলির জন্য সাঁওতালি মাধ্যমে পড়াশোনা করার জন্য অনুমতি পায় তাহলে ছাত্র-ছাত্রীদের মুক্ত কলেজগুলোতে ভর্তি হতে হবে এবং এটা একটা জোরপূর্বক বা বাধ্যতামূলক ব্যাপার এর মত। তাই সাঁওতালি দরদী, সাঁওতালি মাধ্যমে শিক্ষার দরদী মানুষজন যারা আছেন তাদের উচিত সরকারের কাছে দাবি রাখা যাতে করে প্রত্যেকটি জেলা শহরের কলেজগুলোতে এই সাঁওতালি মাধ্যমের ছাত্রছাত্রীরা পড়াশোনা করার সুযোগ পায়, তাহার জন্য দাবি জানানো প্রয়োজনে ছাত্র-ছাত্রীদের স্বার্থে পথে নেমে আন্দোলন করতে হবে। এই সমস্ত ছাত্র-ছাত্রীরা ভবিষ্যতে আমাদের স্বপ্নের সাঁওতালি মাধ্যমের শিক্ষাকে পরবর্তীকালে টেনে নিয়ে যাবে, এরাই হলো আমাদের আগামী দিনের পথ প্রদর্শক তাই এসমস্ত ছাত্র-ছাত্রীদের যাতে কোনরূপ পড়াশোনা করার জন্য অসুবিধা না হয় তা দেখার জন্য আমাদের এই এগিয়ে আসা উচিত।

সাঁওতালি মাধ্যমে শিক্ষা কি আজ ঘোর অন্ধকারের মুখে ??

– বিরেন্দ্র নাথ কিস্কু

সাঁওতালি মাধ্যমে আজ ছাত্র ছাত্রীরা উচ্চমাধ্যমিক পাশ করার পরও শিক্ষার সুনিশিত আজও হলো না। আজও সাঁওতালি মাধ্যমের শিক্ষা সেই ঘোর অন্ধকারের মুখে।

দীর্ঘ বার বৎসর পরেও শিক্ষা ব্যবস্থার কোনরূপ পরিবর্তন হয়নি, সেই সূচনা কাল হইতে শত শত বাধা কাটিয়ে আজও চলছে সাঁওতালি মাধ্যমের পড়াশুনা। অনেক অবহেলার পরও কিন্তু আজও সমান তালে এগিয়ে চলেছে অন্যান্য মাধ্যমের সাথে সাঁওতালি মাধ্যমের পড়াশুনা এবং অতি আনন্দের সাথেই ছাত্র ছাত্রীরা নিজের মাতৃভাষায় শিক্ষালাভ করে চলেছে। ভারতের সংবিধানের অষ্টম তফসিলে সাঁওতালি ভাষার অন্তর্ভূক্তি এর পর থেকেই সাঁওতালি মাধ্যমে শিক্ষার জন্য সমাজের সর্ব স্তরের মানুষ একজোট হয়ে বহু আন্দোলনের ফলে পশ্চিমবঙ্গে বার বৎসর পূর্বে সাঁওতালি মাধ্যমের পথ চলা শুরু হয়েছিল, যদিও তারও অনেক আগে থেকেই সাঁওতালি ভাষাকে বিশ্ব দরবারে পৌঁছানোর একটা চেষ্টা চলে আসছিল।

যাইহোক, সাঁওতালি মাধ্যমের মধ্যে পড়াশুনা শুরু হওয়ার পরও এক শ্রেণীর মানুষজন এটাকে নিয়ে হেঁয় করার চেষ্টা করেছিলেন এবং চিরতরে বন্ধ করার একটা চাপা প্রচেষ্টা ছিল, মাঝ পথে মনে হয়েছিল তারা যেন না পেরে হাল ছেড়ে দিয়েছেন কিন্তু না, যখনই ছাত্র ছাত্রীরা উচু ক্লাসের দিকে পা বাড়াতে চলল তখনই দেখা দিল আর এক বাধা , সেটা কিনা “হাতে না মেরে ভাতে মারার মতো ” —-পাঠ্যপুস্তক ও শিক্ষক/শিক্ষিকার জন্য সাঁওতালি মাধ্যমের পড়াশুনা লাটে উঠার মত অবস্থা। কোন রকমে ভুলে ভরা পাঠ্যপুস্তক ( এর জন্য মাননীয় সাঁওতালি ভাষা দরদী সাঁওতাল শিক্ষকগণও সমান দায়ী) ও স্বেচ্ছাসেবক শিক্ষক দিয়ে সাঁওতালি মাধ্যমের পড়াশুনা এগিয়ে চলেছে। বর্তমানে ভাষা বিষয়ের শিক্ষক ছাড়া আর কোন বিষয়ের পূর্ণ সময়ের শিক্ষক/ শিক্ষিকা নিয়োগ হয়নি। গুটিকয়েক পার্শ্ব শিক্ষক শিক্ষিকাদের( সকল বিষয়ের নয়) দিয়ে পড়াশোনা এগিয়ে চলেছে। বর্তমানে যাহার কোনো সুরাহা হয়নি বা সূরাহা করার কোন প্রচেষ্টা বিন্দুমাত্র দেখতে পাওয়া যায়নি। আদ্য প্রান্ত ভুলে ভরা ও অসম্পূর্ণ বই নিয়েই আজকে ছাত্র ছাত্রীরা উচ্চমাধ্যমিকের গণ্ডি পার করে ফেলল। এর সাথে এটাও বুঝতে পারলাম ছাত্র ছাত্রীরা সত্যিই কতটা মেধা সম্পন্ন। আরও একটা মাইল ফলক সংযুক্ত হলো সাঁওতালি মাধ্যমের শিক্ষার মুকুটে। এই কথা ভেবে সত্যিই গর্ব বোধ করি, কিন্তু একবার ভাবুনতো সেই ছাত্র ছাত্রীদের কথা যারা সদ্য উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে নতুন কলেজ জীবনে প্রবেশ করতে চলেছে সাথে শত শত বাবা মায়ের মুখে হাসি ফুটাতে চেয়ে নিজের পছন্দ বিষয় নিয়ে আরো ভালো করে পড়াশুনা করে ভালো রেজাল্ট করে ভবিষ্যতে একটা সুন্দর জীবন কাটাবে , একটা মনের মত চাকরী করবে, তাদের সামনে আজ ঘোর অন্ধকার। তারা আজও জানেনা সাঁওতালি মাধ্যমের জন্য আদৌ কোন কলেজ বন্দোবস্ত হবে কিনা? হলে সেখানে মনের মত বিষয় নিয়ে পড়াশুনা করতে পারবে কিনা? সেখানেও কি কোন রকমের বই ছাড়াই বেদের মত শুনে শুনে মনে রেখেই পড়াশুনা করতে হবে না কি হবে! যদিও সাঁওতালি দের মধ্যে এই শুনে শুনে মনে রাখার ব্যাপারটা অতি প্রাচীন কাল থেকেই চলে আসছে। যেখানে ছাত্র ছাত্রীরা একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির সমস্ত বিষয়ের বই এখনো হাতে পায়নি তাই এ ভাবনা তাদের মনে আসাটা স্বাভাবিক।

পশ্চিমবঙ্গ সরকারের এব্যাপারে সদিচ্ছার সত্যিই অনেক অভাব আছে তাও পরিষ্কার। তা না হলে এটা বলতে হবে যে সমস্ত সাঁওতালি শিক্ষকগণ এই পাঠ্য পুস্তক রচনা করার দায়িত্ব পেয়েছিলেন উনাদের আন্তরিকতার অভাব আছে। আজকে সরকার সাওতালি শিক্ষার ব্যাপারে এতোটা অবহেলা করলে সাঁওতালি মাধ্যমের শিক্ষা কিন্তু ঘোর অন্ধকারের দিকে পা বাড়াবে। যদিও এরকম হলে নিজেদের মধ্যে সমস্ত ইগোকে দূরে সরিয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করতে সাঁওতালি সংগঠন গুলো কিন্তু জানে এবং এটার যে বিহিত হবে সে বিষয়ে নিশ্চিত। কিন্তু কথাটা হল একটা বিষয় নিয়ে সরকার বাহাদুরকে কতবার তেল দিতে হবে? শুধু মাত্র ভোটে জয়ী হওয়ার জন্য নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি জারি করার কৌশল কিন্তু আজ সবাই জেনে গেছে। আজকে সবাই চাইছে সাঁওতালি মাধ্যমে পূর্ণ সময়ের শিক্ষক । যে ছাত্র ছাত্রীরা আগামী দিনের ভবিষ্যৎ তাদের জীবনকে এভাবে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেওয়া একেবারেই অনুচিত এবং এটা দেশকেই অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেওয়ার সামিল বলে মনে করি। আগামী ২০২৫ সাল সাঁওতালি লিপি “অলচিকির” শতবর্ষ পূর্তি হবে তার আগে সাঁওতালি মাধ্যমের এই দশা কিন্তু খুব ভালো নয়। সাঁওতালি ভাষা জানা কলেজ শিক্ষক দেরও এগিয়ে আসা উচিত এই সময়ে যাহাতে কলেজের কার্যক্রম অব্যাহত রাখা যায়। এছাড়াও সরকারের এব্যাপারে এখনই পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত এবং যে যে কলেজে সাঁওতালি মাধ্যমের পড়াশুনা শুরু হবে সেগুলোর নাম অতিসত্বর প্রকাশ করে ছাত্র ছাত্রীদের মনের সব অন্ধকার এখনই দুর করা দরকার।

« Older Entries