Category Archives: বাংলা কবিতা

কবিতা: সবুজ দ্বীপ

সবুজ দ্বীপ
কবি লক্ষণ কিস্কু

যাবে ভাই মোদের কেচন্দা, সবুজ দ্বীপ
রাইডি গাঁয়ের কোলে কাঁসাই নদীর ঢিপ।
পশ্চিম হতে পূবে রমণীর মতো চলে তটিনী
বারি ভেজা তনু, যেন কাঁখে কলস খানি।
সবুজে সবুজ ঘেরা, ছল ছল জল মাঝে তারা
ময়ূরপঙ্খীর কাজল কালো নয়ন যেন পটল চেরা।
লতায় পাতায় তরু ছায়ায় মিতালি বন বায়
চরণ তলে দুর্বা দলে বন্ধন তব ধূসর শিলায়।
পাখ-পাখালীর কলতান সাঁওতালী গানের মাতন
উল্লসিত কল্লোলিনী, আনন্দ ধারায় মাতে মন।

শরতের আগমনে কাশ ফুলে ঢাকা তট
যেন মনে হয় কোন শিল্পীর আঁকা পট।
শীতের শেষে সর্ষে ফুলে সাজ সাজ রব
গাঁয়ে গঞ্জে লেগে যায় ধুম ; আসছে মকর পরব।

যাবে ভাই যাবে মোদের কাঁসাই নদীর তীরে
ছায়া সু-নিবীড় জঙ্গল মহল বাহু ডোরে
আপণ করবে তোমায় মাঠ ঘাট বালু চর —
খুলে দেবে সব মনের বন্ধ দুয়ার।।

গগনচুম্বী শহর

গগনচুম্বী শহর
-লক্ষণ কিস্কু

আমরা দেখেছি গগনচুম্বী অট্টালিকা
নতুন শহর– ঝাঁ চক্‌ চক্‌ রাস্তা গাড়ী ঢাকা।
দেখেছি, আমেরিকার ট্রেড-সেন্টার কিংবা দুবাইভিলা
মালয়েশিয়া, সাংহাই কিংবা সিঙ্গাপুর পদ্ম’কলা
সাজানো শহর, সাজানো বাগান বাহার
আকাশ ভরা মুক্তোঝরা ; শিউলি ঝুরঝুর।

জাপান ভাবে– নতুন নতুন পরিকল্পনা বহর
ভূমিকম্পে কভূ ধ্বসিবেনা গগনচুম্বী শহর।
লিপ্ট ছাড়া বাড়ি ঘরে আসা যাওয়া
কর্ণ গোচরে প্রবেশিবে মধুর গান গাওয়া,
উঁচু ইমারতে ছুটবে গাড়ী, দুয়ারে দুয়ারে দেবে পাড়ি
ইস্কুল কলেজ, দোকানপাট তারই মাঝে গড়ি।
চারিদিক ঘেরা বদ্ধ কারাগার
হাজার একর জমিন উপর আকাশ ছোঁয়া শহর।
থাকবে না মাথার উপর নীল আকাশ
চরণ তলে দুর্বাদল, সবুজ পৃথিবীর গন্ধ
উড়বে চারিদিক সু-গন্ধী পারফিউম
দিবা-নিশী মজ্‌লিস;– গ্লাসের ঠোঁটে ঘুম।

কবি লক্ষণ কিস্কুর একজোড়া কবিতা

জীবন তরী – লক্ষণ কিস্কু

কোন অজানা মাঝি
ভাঁসিয়ে দিলে তরী
নতুন গাঙে
সকাল কিংবা সাঁঝে।

ভেঁসে ভেঁসে যায় তরী
অজানা পথে
হিন্দোলিত হয়ে সারি সারি
নীল আকাশে পেঁজা তুলোর মতো
দিগন্ত থেকে দিগন্তে ভেঁসে চলে কত!

দেখে যায় নয়ন মেলে
রেখে যায় হৃদয়ের উজাড় করে
তাকায় না তো আর —
ফেলে আসা ঘাটে
কত কী যে বেচাকেনা
করেছে জীবনের হাটে।
দীপ খানি নিভীয়ে
নীলিন হয়ে যায় —
ঐ পরপারে
শান্তিগড়ে।।

দিশারী – লক্ষণ কিস্কু

তোমার চোখের জল অন্ধ আজি
ব্যথা ভরা বুক, ঝরা ফুল সাজি,
তুমি আরো জানো ফিরে
উদিত সূর্যের বার্তা ঘিরে।

খোল তব তোমার মুদিত নয়ন
একাকীত্ব ফেলে সাথী সাথে গমন
পাবে নতুন পথের দিশারী
ঘুচিবে মনের সব বিভাবরী।

আমাদের জানা পাহাড় ঘেরা দেশ
সুন্দর শান্তিনীড়– নেই কোন শেষ।
বিভেদ রহস্য ধীরে চলে পরাভবে
দু:খ বহে — বুঝব আমরা কবে?

সময় গেছে পেরিয়ে

সময় গেছে পেরিয়ে
—————বাপ্পাদিত্য বেসরা

হেমন্তের শিশির ভেজা সূর্যের আলোয় বসে কিশোর-কিশোরীর আবেগ দেখছিলাম।
সুন্দর সাজে খুশির বাতাসে
দোলায়িত হতে হতে উড়ে চলেছিল কচি সবুজ মন
কিচিরমিচির হাসির কোলাহল
যুবতীদের অঙ্গ কারুকার্য
ফেলে আসা অতীতের কোন এক
ভালোলাগার সুপ্ত স্নায়ুতে টোকা দিতে চাইছিল।

পরবের আগমনী আনন্দ
রুজির কাছে অনুঘটক হয়েছিল কদিন,
লক্ষ্য করেছি বেশ।
সন্ধ্যার জোনাকি আলোর জ্যোতি দেখতে
পাতলা চাদর গায়ে
বাইরের বেঞ্চিতে বসেছিলাম কিছুক্ষণ,
আচ্ছা, সেই বান্ধবী কি এখনো
ওরকমই ভাবে?
নাকি পাল্টে গেছে?
বিএড দ্বিতীয় বর্ষে
“প্রাক্তন” দেখেছিলাম বলে
‘বৃদ্ধ’ বলেছিল আমায়।
হয়তো আমারই বয়স হয়ে গেছে
বাকি পার্থিব প্রাণ
এখনো তরতাজা সময়ের সারণির সাথে।
আধুনিক উপভোগের স্বাদ কোরক
ক্ষয়ে জীর্ণ হয়ে গেছে আমার
ঝলমলে রঙের আবেগ
আর স্পর্শ করে না হয়তো
ব্রাত্য আমি ব্রাত্য
সময় গেছে পেরিয়ে।


কাটিআম ২৭/১০/২০২০

জবাব চাই

জবাব চাই – হেমাল হিঁসিদ হাঁসদা

জবাব চাই,জবাব চাই, জবাব চাই-ই চাই
জনগ্ণ চাইছে জবাব, জবাব চাই-ই চাই ;
জনগনের রাজত্বে , জনরাজার বিচার ;
বিচার চাই-ই চাই ।।

এ বাংলা কাদের ? এই বাংলা কার ?
হিন্দু-মুসলমান-শিখ-ইশাই-সান্তাড়
ভাই-ভাই মিলেমিশে এক পরিবার ।।

কত মেলা-কত পুজো-কত উৎসব,
মাঠ ভরা ধান, গাছে-গাছে পাখিদের কলরব;
পূব-পশ্চিম, উত্তর-দক্ষিন শিশু করে রব।।

”যত মত তত পথ” বলেছে বাংলার সন্তান;
বাংলার মাটি, বাংলার বায়ু, বাংলার গগন-
গেয়ে উঠে সাম্য, ঐক্য, ভ্রাতৃত প্রতিবাদেরও গান।।

বাংলা মায়ের বুকে,বহুবার এসেছে আঘাত
মৃত্যুকে পন করে, ভাই-বোনেরা দিয়েছে প্রতিঘাত,
বাংলার গর্ব- হবে না খর্ব,অন্যায়ে কর প্রতিবাদ ।।

রামকৃষ্ণ, সারদা, স্বামীজী, চৈতন্য, লালনের বানী
পবিত্র বাংলার মাটিতে, নেই ধর্মের হানাহানি;
পুরোহিত-ইমাম ভাতায় , দেখি বিভেদের হাতছানি ।।

এ বাংলা কার ? বাংলা কি চাই ?
কে, কাকে বোঝায় ? কে জানতে চাই?
বাংলার মা-মাটি-মানুষ চাইছে জবাব,
জবাবটা চাই-ই চাই ।।

চাষীর হাসি!

চাষীর হাসি!

হেমাল হিসিদ হাঁসদা

আসছে দিন,আসছে দিন,শুনেছি কাল
বুলেট ট্রেনে বেচবে চাষী, মাচা খেতের মাল।।

কাস্তেটা তার পড়ে থাকবে, কুটি্রের কুলুঙ্গিতে
হাল টানা গরু ,মোষ হাসবে মাঠে-ঘাটে।।

আলু,বেগুন,পটল,মুলো তুলবে রোবট
আলের উপর বসে,ধরবে চাষী রিমোট।।

গাঁইতি,কোদাল,শাবল অকেজো হয়ে থাকবে পড়ে
ফ্রিতেই জল পাবে গাছেরা,দেবে বিমান উড়ে উড়ে।।

আহা!রে চাষী ভাই,আসছে দিন শুনেছি কাল
এও শুনছি! আর থাকবে না লঙ্কাতে ঝাল।।

ঝুড়ি,চুপড়ি,বস্তা; ও সব কিছু লাগবে না
মাঠ থেকে গুদামে; মুটে,মজুর থাকবে না।।

ঝিরি-ঝিরি ঘামেতে,সার কেনার কয়টা টাকাতে
ঘুরে আস্তে পার স্বর্গ থেকে বুলেট ট্রেনেতে।।

চাষীর শুধু থাকবে নাম-”রাম হাঁসদা চাষী”
ভারতের চাষী ভাই মাঠে-ঘাটে,থাকবে হাসি-হাসি।।
……………………।*******…………………।।

হারিয়ে গেছে


বীরেন্দ্র নাথ কিস্কু

হারিয়ে গেছে…….
আজ অনেক দিন আগে
যা ছিল সেদিন, সবার হৃদয় মাঝে।
হণ্য হয়ে খুঁজেছি কত, সবার হৃদয় মাঝারে,
কি যে হলো, কোথায় গেলো, এই ভব সাগরে
তাকে ছাড়া অশ্রু জলে জীবন গেলো ভেসে।

এখানে ,সেখানে, কোনখানেই নেই আজ তার দেখা
এ যেন চাঁদ ছাড়া এক পূর্ণিমার কথা ভাবা,
কোথা থেকে আজ কী যে হলো
মানুষ আজ হয়েছে বিনা মান হুশ।
পাপিষ্ট, দুর্বৃততায়নদের ক্ষমতার লালসায়,
নিভৃতে, রজনী কাঁদে হীনমন্যতায়।

আজও টিম টিম করে জ্বলে মোমবাতির আলো
কত এলো, আর কত যে গেলো,
তবুও আজও আলো ছড়াই এই দীন কুটিরে,
এক দিন আসবে সবাই , বসবে মাদুর পেতে
ভুলে যাবে সব ভেদাভেদ, সংকীর্ণ প্রাচীর
ভালোবাসায় ভেসে যাবে, উঠবে সবাই হেসে।

কী যে হলো !!

বিরেন্দ্র নাথ কিস্কু

কোথায় কী যে হলো

বোঝার আগেই সকলেই আতঙ্কিত হলো,

ভয়ে সবাই যে যার বাড়িতে মুখ গুঁজল;

শিশুরা তাদের খেলার মাঠ ছেড়ে গেলো

সমাজের উন্নয়নের চাকা হঠাৎ স্তব্ধ হলো,

কোথাও নাকি জঙ্গি হামলা হলো !

না! তাতো নয়, তাহলে কী হলো?

সারা দেশে দেশে যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু হলো

যার বিরুদ্ধে প্রস্তুতি তাতো জানা গেলো,

চোখে যারে দেখা না যায় সেই হলো

গোলা বারুদের সামনে তাকেই ফেলা হলো।

মাথায় কিছু আসে না এটা কী যে হলো!

খেলার মাঠ সবুজ ঘাসে ঢেকে গেলো,

গরু ,ছাগলের গোচারণ ভূমি হয়ে গেলো।

সারা দেশে দেশে সব যানবাহন বন্ধ হলো,

শুধুই অ্যাম্বুলেন্স এর সাইরেন বাতাসে ভেসে এলো;

হাসপাতাল গুলো সবই ভরে গেলো

চারিদিকে হাহাকার ….. কান্না শোনা গেলো।

এতদিনে বোঝা গেলো ‘ করোনা ভাইরাস ‘এলো,

সংক্রমণের ভয়ে সবাই বাড়িতে বসে রইলো।

লাঠে উঠলো সব পড়াশুনা, স্কুল কলেজ বন্ধ হলো;

ছেলে মেয়েদের কতই না মজা হলো!

অনলাইনে পড়াশুনা শুরু হলো,

মেঘ না চাইতেই, এ যেন জল পড়লো।

দরিদ্র পিতা মাতার মাথায় যেন বাজ পড়লো,

স্বপ্নপূরণ করতে মাথার ঘাম পায়ে পড়লো।

এত দিন পর গ্রাম শহর জীবন এক হলো,

গ্রাম্য জীবনই যে সবচেয়ে ভালো

এক বিংশ শতাব্দীতে এসে তা বোঝা গেলো।।।

ভারতবাসী ও আদিবাসী

হেমাল হিঁসিদ হাঁসদা

হে আমার ভারতবাসী,হে আমার আদিবাসী
চলো আজ করি -প্রতিবাদের শপথ,
লুঠতরাজ,দুরবৃত্তকারীদের নত কর শির
এসো হে ভারতবাসি,এসো হে আদিবাসি ।।

পথে- প্রান্তরে কর অসত্য ,অন্যায়ের প্রতিবাদ
দৃঢ় কর মুষ্টিবদ্ধ আদিবাসী হাত,
হোক আন্দোলন -হোক বিচার,পদে-পদে
কর দৃঢ় অঙ্গিকার -ভারতমাতার পাদপদ্মে ।।

ভারতের বুকে আদিবাসী বারবার সয়েছে
বারবার পদদলিত,লুণ্ঠিত আদিবাসী হয়েছে,
বারবার আদিবাসীদের করেছে আক্রমণ
যুদ্ধক্ষেত্রে হেরেছে, করেছে পলায়ন ।।

হে আমার আদিবাসি ভাই-বোন
বল আজ দৃঢ় প্রতিজ্ঞায়,
আইনের হাত ধরে আইনের সহায়
প্রতিবাদ,প্রতিবাদ,প্রতিবাদেই হবে জয়।।

শক,হুন,পাঠান,মুঘল,ইংরেজ,আরজ
বিদেশী জাতির আক্রমণ আদিবাসী করেছে সহ্য;
ভাষা,সংস্কৃতি,ধর্ম-আদিবাসিদের নিজস্বতায় প্রবহমান
লুন্ঠনকারিদের আক্রমণেও নক্ষত্রদের মতো জাজ্জল্যমান।।

আদিবাসিরা ভারতের বুকে আপন করিল সব জাতিকে,
সব জাতিকে সহোদর ভাই ভেবে ঠাঁই দিল ভারতমাতার বুকে;
হায়! যারা ইতিহাসে বিদেশি-তাদের দ্বারাই অপমানিত আদিবাসী
এর প্রতিবাদ করতেই হয়; জাগো ,জাগো আদিবাসী ।।

ভারতের বুকে বেড়ে চলা ধর্ষন,ব্যভিচার,ধরমের খুনোখুনি
এতো নয় ভারত সংস্কৃতি! বহিরাগত-বিদেশি আমদানি,
আজ নুতন ভারত গড়তে;এসো! হে আদিবাসী
সর্বশ্রেষ্ঠ গড়তে ভারত,এসো! হে ভারতবাসী।।

হে আমার ভারতবাসী! হে আমার আদিবাসী!
চলো আজ শপথ করি নতুন ভারতের,
ভারতের সব জাতি এক সাথে,একলক্ষ্যে, করি অঙ্গীকার। জাতি-ধর্ম-ভাষা ভেদাভেদ ভুলে,ভারতমাতার হোক জয়-জয়জয়কার।।

সবিকায়মন

লক্ষণ কিস্কু

ধনে ভরে না কভূ মন
আরো চাই, আরো চাই, পণ
মন ভোমরা ; — কুবের কন
থাকতো যদি সাগর ভরা ধন,
গড়তাম বধূয়ার অলংকার
দেবীর মতো সাজ বাহার
ঝলকিত দুল কণ্ঠ ভরা হার
ঝম্‌ঝম্‌ মখমল পায়ের নূপুর।

ফকির কহে ছিন্ন বস্ত্র মোর শোভন
বাড়ি ঘর মোর মুক্ত গগন।
প্রেমহীন ভালোবাসা কাঁদায় মন
প্রেমিকের কিবা দোষ সবিকায়মন।।

« Older Entries